Connect with us

সাহিত্য ও গল্প

আজ আহমদ ছফা’র জন্মদিন: প্রতিবাদী ও প্রগতিশীল কণ্ঠস্বর

Published

on

আহমদ ছফা, বাংলা সাহিত্যের এক উজ্জ্বল নক্ষত্র, ষাটের দশকের শুরু থেকে দীর্ঘ তিন দশকেরও বেশি সময় ধরে বাংলা সাহিত্যকে সমৃদ্ধ করেছেন। একজন লেখক, সমালোচক, অনুবাদক, সম্পাদক এবং সমাজকর্মী হিসেবে তার অবদান অনস্বীকার্য। তিনি একাধারে লেখক, ঔপন্যাসিক, কবি, চিন্তাবিদ ও গণবুদ্ধিজীবী। তিনি বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধের একজন সক্রিয় অংশগ্রহণকারী ছিলেন এবং স্বাধীন বাংলাদেশের গঠনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছেন।

আহমদ ছফার লেখার মূল ভাবধারা ছিল প্রথাবিরোধিতা, স্পষ্টবাদিতা এবং স্বকীয় দৃষ্টিভঙ্গি। তিনি “বুদ্ধিবৃত্তির নতুন বিন্যাস”, “বাঙালি মুসলমানের মন”, “ওঙ্কার”, “গাভী বিত্তান্ত”, “পুষ্প বৃক্ষ এবং বিহঙ্গ পুরাণ” ইত্যাদি বিখ্যাত রচনার জন্য পরিচিত।

১৯৪৩ সালের ৩০শে জুন, চট্টগ্রাম জেলার গাছবাড়িয়ায় এক কৃষক পরিবারে জন্মগ্রহণ করেন আহমেদ ছফা। তাঁর পিতা ছিলেন হেদায়েত আলী এবং মা আসিয়া খাতুন। দুই ভাই ও চার বোনের মধ্যে দ্বিতীয় সন্তান ছিলেন আহমদ ছফা।

আহমেদ ছফার শিক্ষা জীবন শুরু হয় তার পিতার প্রতিষ্ঠিত দক্ষিণ গাছবাড়িয়া প্রাথমিক বিদ্যালয়ে। ছোটবেলা থেকেই তিনি ছিলেন জ্ঞানপিপাসু এবং বই পড়ার প্রতি তার ছিল অসাধারণ আগ্রহ। ১৯৫৭ সালে তিনি নিজ গ্রামের নিত্যানন্দ গৌরচন্দ্র উচ্চ বিদ্যালয় থেকে ম্যাট্রিকুলেশন পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হন। ছাত্রাবস্থায় তিনি কৃষক সমিতি-ন্যাপ বা তৎকালীন গোপন কমিউনিস্ট পার্টির সাথে যুক্ত হন। মাস্টারদা সূর্যসেনের বিপ্লবী কর্মকাণ্ডে অনুপ্রাণিত হয়ে তিনি কয়েকজন বন্ধু মিলে চট্টগ্রাম-দোহাজারী রেললাইন উপড়ে ফেলেন। পরে গ্রেপ্তার এড়াতে কিছুকাল পার্বত্য চট্টগ্রামে আত্মগোপন করেন। ১৯৬২ সালে তিনি চট্টগ্রাম নাজিরহাট কলেজ থেকে উচ্চ মাধ্যমিক পাশ করেন। একই বছর তিনি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বাংলা বিভাগে ভর্তি হন। কিন্তু পরে তিনি রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিভাগে স্থানান্তরিত হন এবং ১৯৬৭ সালে ব্রাহ্মণবাড়িয়া কলেজ থেকে প্রাইভেটে বি.এ. পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হন। ১৯৭১ সালে তিনি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিভাগ থেকে এম.এ. ডিগ্রি লাভ করেন। ১৯৭০ সালে তিনি বাংলা একাডেমির পিএইচডি গবেষণা বৃত্তির জন্য আবেদন করেন এবং “১৮০০ খ্রিষ্টাব্দ থেকে ১৮৫৮ খ্রিষ্টাব্দ পর্যন্ত বাংলার মধ্যবিত্ত শ্রেণির উদ্ভব, বিকাশ, এবং বাংলার সাহিত্য-সংস্কৃতি ও রাজনীতিতে তার প্রভাব” বিষয়ে গবেষণা শুরু করেন। কিন্তু মুক্তিযুদ্ধের কারণে তিনি তার গবেষণা সম্পন্ন করতে পারেননি। নাসির আল মামুনের লেখা ‘আহমদ ছফার সময়’ নামে বইটিতে একটি সাক্ষাৎকারে আহমদ ছফা বলেছিলেন, ‘একটা মানুষের মধ্যেই গোঁজামিল থাকে। কিন্তু যে সাপ সে হান্ড্রেড পারসেন্ট সাপ। যে শেয়াল সে হান্ড্রেড পার্সেন্ট শেয়াল। মানুষ সাপও হইতে পারে, শেয়ালও হইতে পারে, পাখিও হইতে পারে। মানুষেরই বিভিন্ন চরিত্র নেয়ার ক্ষমতা আছে। বুঝছো, গ্রাম দেশে আগে সাপ আর শেয়াল পাওয়া যাইতো। এগুলা নাই এখন। কারণ সাপ, শেয়াল এরা মানুষ হিসাবে জন্মাইতে আরম্ভ করছে।’ বাংলাদেশের সাহিত্য ইতিহাসের অন্যতম প্রতিবাদী এবং প্রগতিশীল লেখক আহমদ ছফা। তিনি তাঁর কলমকে অস্ত্রে পরিণত করেছিলেন। আর কলম দিয়ে লেখা প্রতিটি শব্দ যেন এক-একটা বুলেট।আহমদ ছফা ছিলেন অত্যন্ত সাদামাটা মানুষ। তাই সহজে ছুঁয়ে গেছেন মানুষের হৃদয়। স্বাধীনতা পরবর্তী সময়ের বাংলাদেশের অন্যতম শ্রেষ্ঠ চিন্তাবিদ, জাতির শিক্ষক ও জাতির দর্পণ হিসেবে আহমদ ছফাকে অভিহিত করা হয়। তিনি ছিলেন শোষিত মানুষের পক্ষে এক বলিষ্ঠ কণ্ঠস্বর। অনেকেই আহমদ ছফাকে প্রাবন্ধিক হিসেবে দেখলেও তিনি ছিলেন বহুমাত্রিক প্রতিভার অধিকারী। একাধারে রাজনীতিক, কবি, ঔপন্যাসিক, চিন্তাবিদ ও বিশিষ্ট কলামিস্ট।বাংলা সাহিত্যে এ পর্যন্ত যত প্রাবন্ধিক, লেখক ও সাহিত্যিক জন্ম নিয়েছেন, তাদের মধ্যে আহমদ ছফাই সবচেয়ে সাহসী, কুশলী ও বহুমাত্রিক। যে সত্য প্রকাশ করতে তাঁর সমকালীন অনেক বড় বড় লেখকও হিমশিম খেতেন, তিনি তা অসংকোচে অবলীলায় প্রকাশ করতেন। তাঁর লেখায় বাংলাদেশি জাতিসত্তার পরিচয় নির্ধারণ প্রাধান্য পেয়েছে।

মানবিক মূল্যবোধ ও গুণাবলির জন্যও আহমদ ছফা ছিলেন অনন্য। সারা জীবন শুধু লেখা-লেখি নিয়ে ব্যস্ত থাকেননি। অনেকের সুখ-দুঃখের অংশীদারও হয়েছেন। বিপদে পাশে এসে দাঁড়িয়েছেন যেমন তেমননি সামর্থ অনুযায়ী সহায়তাও করেছেন। বাংলা সাহিত্য ও বাংলাদেশের অনেক প্রখ্যাত লেখক তাঁর কাছে চিরকৃতজ্ঞ থাকবে। কারণ, তাঁরা তাঁর সহযোগিতা না পেলে হয়তো লেখকও হয়ে উঠতো না। এরকম উদাহরণ অনেক আছে। সবার কথা বলতে গেলে পাতার পর পাতা শেষ হয়ে যাবে। আজ শুধু চিত্রশিল্পী এস এম সুলতানের কথাই বলবো। আমরা সবাই চিত্রশিল্পী এস এম সুলতানকে চিনি। বেঁচে থাকতে তিনি আজকের মতো এতোটা জনপ্রিয়তা পাননি। আহমদ ছফা শিল্পী সুলতানের আঁকা ছবিতে মুগ্ধ হয়েছিলেন। কিন্তু সেসময়কার ঢাকায় প্রতিষ্ঠিত অন্যান্য চিত্রশিল্পীরা হিংসাত্মক মনোভাব নিয়ে তাঁর পেছনে লেগে ছিলো। এই বিষয়টা খুব ভালোভাবে লক্ষ করেছিলেন আহমদ ছফা। তিনি মনে মনে ঠিক করলেন, সুলতানের পাশে দাঁড়াতেই হবে। পরবর্তীতে অনেক বাধা বিপত্তির পরেও আহমদ ছফা শিল্পী সুলতানের পাশে ছিলেন এবং সহযোগিতা করে গেছেন। আহমদ ছফা সুলতান ও তার শিল্পকে সবার নজরে আনার জন্য ৫০ পৃষ্ঠার গোটা একটি প্রবন্ধ লিখে ফেলেছিলেন। প্রবন্ধটির নাম ‘বাংলার চিত্র ঐতিহ্য: সুলতানের সাধনা’। ওই প্রবন্ধটি সবার নজরে আসার কিছুদিনের মধ্যে সুলতানের খ্যাতি পুরো বাংলায় ছড়িয়ে পড়ে। যদিও ততদিনে সুলতান আর বেঁচে ছিলেন না।আহমদ ছফা বাংলাদেশের বুদ্ধিবৃত্তিক জগতের মানচিত্র অঙ্কন করেছেন। করেছেন বুদ্ধিজীবীদের ব্যর্থতায় বাংলাদেশের কী দুর্দশা হতে পারে তার সম্পর্কে ভবিষ্যদ্বাণী। তিনি ছিলেন বাংলা সাহিত্যজগতের অনুপ্রাণিত একজন স্রষ্টা। যার কর্মের মাধ্যমে লেখক, শিল্পী, বুদ্ধিজীবী, চলচ্চিত্রকারসহ অনেকে উৎসাহ পেয়েছেন প্রতিনিয়ত। যদি নাম বলা হয় তার মধ্যে অন্যতম আছেন হুমায়ূন আহমেদ, ফরহাদ মজহার, মুহম্মদ জাফর ইকবাল, তারেক মাসুদ, সলিমুল্লাহ খানসহ অনেকে। তাকে বলা হয় স্বাধীন বাংলাদেশের সর্বোত্তম ও সর্বশ্রেষ্ঠ বুদ্ধিজীবী।

সলিমুল্লাহ খান আহমদ ছফাকে ‘গরীবের রবীন্দ্রনাথ’ বলে আখ্যায়িত করেছেন। তাঁর প্রবন্ধে সলিমুল্লাহ খান লিখেন, ‘গ্যেটের সঙ্গে পরিচিত হওয়ার পূর্ব পর্যন্ত রবীন্দ্রনাথ ছিলেন আমার জীবনে মহত্তম মানুষ, জীবনের সমস্ত সমস্যা-সংকটে আমি রবীন্দ্রনাথের রচনা থেকে অনুপ্রেরণা সঞ্চয় করেছি।’পড়াশোনা চলাকালীন অবস্থায় সুধাংশু বিমল দত্তের মাধ্যমে কৃষক সমিতি ন্যাপ বা তৎকালীন জনপ্রিয় গোপন কমিউনিস্ট পার্টির সাথে সক্রিয়ভাবে যুক্ত হন। মাস্টারদা সূর্য সেনের বিপ্লবী কর্মকা- ব্যাপকভাবে অনুপ্রাণিত করে আহমদ ছফাকে। কয়েকজন বন্ধুকে নিয়ে চট্টগ্রাম-দোহাজারী রেললাইন উপড়ে ফেলেন তিনি। পরবর্তীতে তিনি গ্রেপ্তার এড়াতে এবং পুলিশের হাত থেকে বাঁচতে পার্বত্য চট্টগ্রামে কিছুদিন আত্মগোপন করেন।সত্যি কথা বলতে কি, আহমদ ছফার বিস্তৃতি অনেক। আমার এই ছোট্ট একটি নিবন্ধে পুরো বিস্তৃতি শেষ করা সম্ভব না। এরপরও যতটুকু সম্ভব তুলে ধরছি। আগামীর উদ্দেশ্যে। ষাটের দশকে সাহিত্য জগতে পা রাখেন আহমদ ছফা। সমসাময়িক উপন্যাস লেখকগণের মধ্যে তিনি ছিলেন একেবারেই আলাদা। তিনি বেশ কয়েকটি উপন্যাস রচনা করেছেন। সেগুলোর মধ্যে উল্লেখযোগ্য উপন্যাস হলো ‘সূর্য তুমি সাথী’, গাভী বিত্তান্ত’, ‘পুষ্প, বৃক্ষ এবং বিহঙ্গ পুরাণ’, ‘অলাতচক্র’ ‘মরণবিলাস’, ‘অর্ধেক নারী অর্ধেক ইশ্বরী’ ইত্যাদি।১৯৬৭ সালে প্রকাশিত হয় আহমদ ছফার প্রথম উপন্যাস ‘সূর্য তুমি সাথী’। বক্তব্যের স্পষ্টতা আর তীব্রতার জন্য খুব দ্রুত পাঠকদের মাঝে সাড়া ফেলে দেন তিনি। তার আরেকটি বেশ জনপ্রিয় উপন্যাস হলো ‘গাভী বিত্তান্ত’। উপন্যাসটিতে তৎকালীন সময়ে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে উপাচার্য ও শিক্ষকদের রাজনীতি প্রকাশ পেয়েছে বইটিতে। যে উপন্যাস সম্পর্কে বলতে হয় সেটি হলো ‘পুষ্প, বৃক্ষ এবং বিহঙ্গ পুরাণ’। তাঁর এই গ্রন্থটি জীবন সম্পর্কে তাঁর বোধ, প্রকৃতি সম্পর্কে তাঁর ভাবনাসহ সকল কিছু একসঙ্গে গেঁথে দেয়।আহমদ ছফার যে বিষয়টি একজন নতুন পাঠককে আকৃষ্ট করে তা হচ্ছে রচনার সাবলীলতা। তিন তাঁর লেখনিতে মুক্তিযুদ্ধকে অনেকবার স্মরণ করেছেন। তিনি নিজেও ছিলেন একজন মুক্তিযোদ্ধা। মুক্তিযুদ্ধ নিয়ে রচিত ‘অলাতচক্র’ মুক্তিযুদ্ধের পর বাংলাদেশের একটি পূর্ণাঙ্গ উপন্যাস। এই উপন্যাসটিতে তিনি মুক্তিযুদ্ধের সময় ঘটে যাওয়া বিভিন্ন ঘটনাকে ফুটিয়ে তুলেছেন। ভারতীয় শরণার্থী শিবিরে তিনি প্রত্যক্ষভাবে উপস্থিত ছিলেন। এই উপন্যাসে শরণার্থী বিষয়ও উঠে এসেছে। ১৯৮৬ সালের দিকে এসে জার্মান ভাষার উপর গ্যেটে ইন্সটিটিউট থেকে ডিপ্লোমা ডিগ্রি লাভ করেন তিনি। গ্যেটের অমর সাহিত্য ‘ফাউস্ট’ অনুবাদের ক্ষেত্রে এটিই ছিল প্রথম সোপান।আহমদ ছফার যে দুইটি উপন্যাসের কথা না বললেই নয়। আহমদ ছফা একদিকে লিখেছেন ‘একজন আলী কেনানের উত্থান পতন’ আর অন্যদিকে লিখেছেন ‘বাঙালি মুসলমানের মন’ উপন্যাস দুটি। ছফা যেখানে আলী কেনানকে অসাধারণ করে তুলেছেন তাঁর চরিত্রের মাধ্যমে অন্যদিকে আঘাত করেছেন ধর্ম ব্যবসার মূলকে। যারা মাজার পুজো করে এবং মাজার নিয়ে ব্যবসা করে। ছফা ‘বাঙালি মুসলমানের মন’ প্রবন্ধে মুসলমান যে আলাদা একটি জাতি ও গোত্র সেটা তিনি সেখানে সুন্দরভাবে ফুটিয়ে তুলেছেন।

আহমদ ছফার লিখিত প্রবন্ধগুলো মূলত দুইভাগে ভাগ। একভাগ হচ্ছে রাজনীতি আরেকভাগ হচ্ছে অরাজনৈতিক। অরাজনৈতিক প্রবন্ধগুলোতে তিনি দর্শন এবং বিভিন্ন শিল্পী এবং সামাজের বিভিন্ন বিষয় নিয়ে লিখেছেন।তিনি সাহিত্যের নির্যাস নিয়েছিলেন রবীন্দ্রনাথ থেকে। আর জ্ঞানের নির্যাস নিয়েছিলেন তৎকালীন জাতীয় অধ্যাপক জ্ঞানতাপস প্রফেসর আব্দুর রাজ্জাক থেকে। অধ্যাপক আব্দুর রাজ্জাক ছফার জীবনে বড় ভূমিকা রাখেন। যা ‘যদ্যপি আমার গুরু’ গ্রন্থটি পাঠ করলে স্পষ্টই বোঝা যায়।আহমদ ছফা মূলত তাঁর রাজনৈতিক প্রবন্ধগুলোর জন্য সেসময় আলেচিত ছিলেন। তিনি বাংলাদেশের রাজনৈতিক সাহিত্যকে অন্যমাত্রায় নিয়ে আসেন। তাঁর সাহসী কলমের কালিতে উঠে এসেছে রাষ্ট্র ও রাজনীতির নির্মম সত্য।জাসদের (জাতীয় সমাজতান্ত্রিক দল) মুখপত্র ‘দৈনিক গণকণ্ঠে’ লিখতেন আহমদ ছফা। গণকণ্ঠেই মূলত তাঁর রাজনৈতিক প্রবন্ধ ‘বুদ্ধিবৃত্তির নতুন বিন্যাস’ প্রকাশিত হয়। গ্রন্থটি এখনও বাংলাদেশে রাজনীতি সাহিত্যে অনবদ্য এক সৃষ্টি হিসেবে রয়ে গেছে। ‘বাংলাদেশের রাজনৈতিক জটিলতা’ প্রবন্ধে তিনি তৎকালীন বাংলাদেশের রাজনৈতিক দলগুলোকে সুন্দর ভাবে ফুটিয়ে তুলেছেন। আশ্চর্যজনক হলেও সত্য, সত্তুরের দশকে ছফার সেই খুঁজে পাওয়া সমস্যাগুলোর সাথে আজকের সমস্যা ও প্রাসঙ্গিকতা যে কেউ খুব সহজে মিলিয়ে নিতে পারেন। সর্বপ্রথম ১৯৭২ সালে প্রকাশিত এই প্রবন্ধটি ১৯৯৬ সালে যখন ‘সাম্প্রতিক বিবেচনা’ গ্রন্থে সংযোজন সহ পুনর্মুদ্রিত হয় তখন তিনি দেখিয়ে দেন কিভাবে তাঁর করা রাজনৈতিক ভবিষ্যদ্বাণীগুলো সত্য হয়েছে।

তিনি বাংলা ভাষা নিয়েও একটি গ্রন্থ লিখেছিলেন। সেটি হচ্ছে ‘বাংলা ভাষা রাজনীতির আলোকে’। এই গ্রন্থটিতে ছফা বাংলাভাষার উপনিবেশায়ন নিয়ে বিস্তর আলাপ করেছেন।কবি হিসেবেও আহমদ ছফা বাংলা সাহিত্যে বেশ গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছেন। তাঁর ‘প্রবীণ বটের কাছে প্রার্থনা’, ‘লেনিন ঘুমোবে এবার’ ‘জল্লাদ সময়’ ইত্যাদি গ্রন্থগুলো বেশ সাড়া জাগিয়েছে দেশে।এছাড়া আহমদ ছফা বিভিন্ন সময় পত্রপত্রিকায় প্রচুর কলাম লিখেছেন। যেগুলোতে সমাজ, রাষ্ট্রের এবং মানুষের চিত্র ফুটে উঠেছে। সমস্যা ও সম্ভাবনার কথা তুলে ধরেছেন।আহমদ ছফা বাংলা সাহিত্যের গুরুত্বপূর্ণ একটি নাম। শুধু নাম বললেই ভুল হবে, বলা যায় বাতিঘর। তাঁর রচনাগুলো শুধু পাঠ করলেই হবে না, সাথে তাকেও বুঝতে হবে। আর তাকে বুঝতে পারলেই বোঝা যাবে বাঙালি মুসলমান গোষ্ঠীকে।

Continue Reading
Click to comment

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

জাতীয়

ভিন্ন আবহে শুরু ভাষা আন্দোলনের মাস, নেই বইমেলার আমেজ

Published

on

By

শুরু হয়েছে বাঙালির ভাষা আন্দোলনের মাস ফেব্রুয়ারি। তবে এবার ফেব্রুয়ারি মাসের শুরুটা ব্যতিক্রম। দীর্ঘদিনের ধারাবাহিকতা ভেঙে ভাষার মাসের প্রথম দিনে শুরু হচ্ছে না “অমর একুশে বইমেলা”। জাতীয় সংসদ নির্বাচনের কারণে এবার নির্ধারিত সময়ে শুরু হচ্ছে না বইমেলা।

প্রতিবছর ফেব্রুয়ারির প্রথম দিন থেকেই ভাষা আন্দোলনের স্মরণে নানা কর্মসূচির পাশাপাশি বইমেলার আয়োজন বাঙালির সাংস্কৃতিক জীবনের অবিচ্ছেদ্য অংশ হয়ে উঠেছে। ভাষা শহীদদের প্রতি শ্রদ্ধা আর বইমেলার মিলিত আবহেই সাধারণত শুরু হয় ভাষার মাস। এবার সেই পরিচিত চিত্র অনুপস্থিত।

ফেব্রুয়ারি বাঙালির কাছে শুধুই একটি মাস নয়। এটি আত্মত্যাগ, প্রতিবাদ ও ভাষাভিত্তিক পরিচয় অর্জনের মাস। ১৯৫২ সালের ২১ ফেব্রুয়ারি রাষ্ট্রভাষা বাংলার দাবিতে ঢাকার রাজপথে জীবন উৎসর্গের মধ্য দিয়ে বাঙালির জাতীয় জীবনে প্রতিষ্ঠিত হয় মাতৃভাষার অধিকার। যারা সেদিন শহীদ হয়েছিলেন, তাদের স্মৃতির প্রতি শ্রদ্ধা জানাতেই পুরো মাসজুড়ে নানা কর্মসূচি পালিত হয়।

ভাষা আন্দোলনের ঐতিহাসিক তাৎপর্য আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি পায় ১৯৯৯ সালে। ওই বছর ইউনেস্কো ২১ ফেব্রুয়ারিকে ‘আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস’ হিসেবে ঘোষণা করে। এরপর থেকে একুশে ফেব্রুয়ারি শুধু বাংলাদেশ নয়, বিশ্বের বিভিন্ন দেশেই মাতৃভাষার মর্যাদা রক্ষার প্রতীক হিসেবে পালিত হয়ে আসছে।

ভাষা আন্দোলনের সূত্রপাত ঘটে পাকিস্তান প্রতিষ্ঠার পরপরই। ১৯৪৮ সালের ২১ মার্চ ঢাকার রেসকোর্স ময়দানে এক জনসভায় পাকিস্তানের গভর্নর জেনারেল, গণপরিষদের সভাপতি ও মুসলিম লিগের সভাপতি মোহাম্মদ আলি জিন্নাহ ঘোষণা দেন, ‘পাকিস্তানের রাষ্ট্রভাষা হবে উর্দু, অন্য কোনও ভাষা নয়।’ একই বক্তব্য তিনি কার্জন হলেও দেন। সেখানে উপস্থিত কয়েকজন ছাত্র ‘না’ ‘না’ বলে প্রতিবাদ জানান। পরে একদল ছাত্র জিন্নাহর কাছে স্মারকলিপি দিয়ে বাংলাকে পাকিস্তানের অন্যতম রাষ্ট্রভাষা করার দাবি জানান। এর মধ্য দিয়েই রাষ্ট্রভাষা আন্দোলনের সূচনা ঘটে।

এর আগে ১৯৪৭ সালের সেপ্টেম্বরে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের কয়েকজন ছাত্র ও অধ্যাপক গড়ে তোলেন তমদ্দুন মজলিস। রাষ্ট্রভাষা প্রশ্নে সভা-সমাবেশ ও আলোচনার মাধ্যমে সংগঠনটি আন্দোলনকে সংগঠিত করে তোলে। পাশাপাশি গঠিত হয় রাষ্ট্রভাষা সংগ্রাম পরিষদ, যা আন্দোলনকে আরও বিস্তৃত করে।

১৯৪৮ সালের ২ মার্চ তমদ্দুন মজলিস, গণআজাদী লীগ, পূর্ব পাকিস্তান ছাত্রলীগসহ বিভিন্ন সংগঠনের উদ্যোগে ফজলুল হক হলে সর্বদলীয় রাষ্ট্রভাষা সংগ্রাম পরিষদ গঠিত হয়। ওই দিনই ১১ মার্চ সারা পূর্ব বাংলায় সাধারণ ধর্মঘট পালনের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। ধর্মঘট চলাকালে শেখ মুজিবুর রহমান, শামসুল হক, অলি আহাদসহ ৬৯ জনকে গ্রেফতার করা হলে ঢাকায় ১৩ থেকে ১৫ মার্চ ধর্মঘট পালিত হয়।

ভাষা আন্দোলনের ধারায় নতুন উত্তেজনা তৈরি হয় ১৯৪৮ সালের শেষ দিকে। করাচিতে অনুষ্ঠিত নিখিল পাকিস্তান শিক্ষা সম্মেলনে তৎকালীন শিক্ষামন্ত্রী ফজলুর রহমান বাংলা ভাষা আরবি হরফে লেখার প্রস্তাব দেন। পরের বছর ১২ ফেব্রুয়ারি পেশোয়ারে অনুষ্ঠিত শিক্ষা উপদেষ্টা বোর্ডের সভায় তিনি বাংলা হরফ বাতিল করে আরবি হরফ প্রবর্তনের ঘোষণা দেন। এর প্রতিবাদে ১৯৪৯ সালের ২৪ ফেব্রুয়ারি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বাংলা বিভাগের ছাত্রছাত্রীরা প্রতিবাদ সভা করেন এবং বাংলা হরফ রক্ষার আন্দোলন জোরদার করেন।

ক্রমেই বাংলাভাষার সমমর্যাদার দাবিতে পূর্ব বাংলায় আন্দোলন দানা বাঁধে। আন্দোলন দমনে সরকার ঢাকায় ১৪৪ ধারা জারি করে মিছিল ও সমাবেশ নিষিদ্ধ করে।

১৯৫২ সালের ২১ ফেব্রুয়ারি ১৪৪ ধারা অমান্য করে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র ও প্রগতিশীল রাজনৈতিক কর্মীরা বিক্ষোভ মিছিল বের করেন। ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ এলাকায় পুলিশের গুলিতে সালাম, জব্বার, রফিক, বরকত, শফিকসহ আরও অনেকে শহীদ হন।

রক্তের বিনিময়ে অর্জিত ভাষার অধিকার বাঙালিকে আর্থ-সামাজিক ও রাজনৈতিকভাবে নতুন পথ দেখায়। সেই পথ ধরেই এগিয়ে যায় স্বাধিকার আন্দোলন, যার পরিণতিতে ১৯৭১ সালে নয় মাসের মুক্তিযুদ্ধের মধ্য দিয়ে জন্ম নেয় স্বাধীন ও সার্বভৌম বাংলাদেশ।

i

Continue Reading

সাহিত্য ও গল্প

Published

on

By

prothom alo, bangladesh pratidin, jugantor, samakal, ittefaq, naya diganta, manab kantha, kaler kantho, janakantha, bonik barta, manab zamin, sangbad, inqilab, bhorer kagoj, daily star, dhaka tribune, bdnews24, bangla tribune, risingbd, bangla news 24, bangladesh journal, jamuna tv, somoy tv, channel 24, ntv, rtv, atn bangla, ekushey tv, independent tv, maasranga tv, boishakhi tv, banglavision, channel i, my tv, desh tv, dbc news, satv, deepto tv, mohona tv, btv, sangsad tv, atn news, ekattor tv

Jamuna TV – jamuna tv, যমুনা টিভি Somoy TV – somoy tv, সময় টিভি Channel 24 – channel 24, চ্যানেল ২৪ NTV – ntv bangladesh, এনটিভি RTV – rtv bangladesh, আরটিভি ATN Bangla – atn bangla, এটিএন বাংলা Ekushey TV – ekushey tv, একুশে টিভি Independent TV – independent tv bd Maasranga TV – maasranga tv, মাছরাঙা টিভি Boishakhi TV – boishakhi tv, বৈশাখী টিভি Banglavision – banglavision, বাংলাভিশন Channel i – channel i, চ্যানেল আই DBC News – dbc news, ডিবিসি নিউজ Ekattor TV – ekattor tv, একাত্তর টিভি

Continue Reading

top3

জুম্মা মোবারক:সূরা আল-কাহফ এর বিশ্লেষণাত্মক প্রতিবেদন

Published

on

By

সূরা আল-কাহফের পটভূমি
সূরা আল-কাহফ কুরআনের ১৮তম সূরা এবং এটি মক্কায় অবতীর্ণ মক্কী সূরা। এটি মোট ১১০ আয়াতের সমন্বয়ে গঠিত। সূরাটি মূলত বিশ্বাসীদের পরীক্ষা-নিরীক্ষার সময় ইমানকে দৃঢ় করার জন্য নাজিল হয়। নবী মুহাম্মদ (সা.) যখন মক্কায় দুনিয়াবিদের মুশরিকদের সঙ্গে মোকাবিলা করছিলেন, তখন অনেক ধর্মীয় বিভ্রান্তি ও সংশয় সৃষ্টি হয়। আল্লাহ তায়ালা ওই দশকে এই সূরা নাজিল করে মানুষের এ ধরণের দ্বিধা দূর করতে এবং সৎ পথ অনুসরণের জন্য পাঠ দেয়।

সূরার প্রধান গল্প ও শিক্ষা
সূরাটিতে প্রধান চারটি গল্প বর্ণিত হয়েছে:

  • কাহফের ছেলেদের গল্প: একদল নবীন যারা ঈমানের জন্য গুহায় আশ্রয় নেয় এবং বহু বছর ঘুমিয়ে থাকে, যা ধৈর্য, বিশ্বাস ও আল্লাহর সাহায্যের প্রতীক।
  • দুই বাগানের মালিকের গল্প: একজন ধনী ব্যক্তি তার সম্পদ নিয়ে অহংকারী ছিল, শেষমেষ তার সবকিছু ধূলিসাৎ হয়, যা পার্থিব জীবনের অনিশ্চয়তা ও পরকালের গুরুত্ব তুলে ধরে।
  • মোসা আলে ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া আলেহি ওয়াসাল্লামের যাত্রা: খেদরের সঙ্গে তার সাক্ষাতের মাধ্যমে জানানো হয় যে আল্লাহর শিক্ষা ও পরিকল্পনা মানুষের বোধগম্যতার বাইরে।
  • জুলকর্ণাইন এর গল্প: এক আদর্শ শাসকের গল্প, যিনি ন্যায়ের পথে সমাজের নিরাপত্তা ও কল্যাণ মূলক কাজ করেন।

শেখার বিষয়

  • ঈমানকে দৃঢ় রাখা উচিৎ, বিশেষ করে জীবনের কঠিন মুহূর্তে।
  • দুনিয়ার সম্পদ অস্থায়ী, তাই পরকালের জন্য প্রস্তুতি নিতে হবে।
  • আল্লাহর পরিকল্পনা সবসময় আমাদের বোধের বাইরে, তাই তাঁর সিদ্ধান্তে সন্তুষ্ট থাকতে হবে।
  • ধৈর্য ও কষ্টসহিষ্ণুতা আল্লাহর পক্ষ থেকে পরীক্ষার অংশ।
  • জ্ঞান এবং অনুসন্ধান মাথাব্যথার কারণ নয়, বরং আল্লাহর রহস্য বোঝার চেষ্টা করা উচিত।

সূরা আল-কাহফের গুরুত্ব ও প্র্যাকটিস

  • মুসলিমরা প্রতি শুক্রবার রাতে সূরা আল-কাহফ পড়ার গুরুত্ব দেন, যা সাপ্তাহিক প্রতিকূলতা থেকে রক্ষা করে।
  • এটি মুমিনের জীবনে আলোর কাজ করে, অন্ধকার ও মিথ্যার বিরুদ্ধে প্রতিরোধ গড়ে তোলে।
  • সূরার ১৮তম আয়াত বিশেষভাবে কুরআনে ‘নূরের আয়াত’ নামে পরিচিত, যা আলোর প্রতীক হিসেবে সুপরিচিত।
  • দৈনন্দিন জীবনে আল্লাহর আদেশ ও সিদ্ধান্ত মেনে চলার অনুপ্রেরণা দেয়।


সূরা আল-কাহফ আমাদের জীবনের পরীক্ষার সময়ে আল্লাহর সাহায্য, ধৈর্য্য ও স্থিরতার শিক্ষা দেয়। এটি পার্থিব জীবনের অসারতা ও পরকালের গুরুত্ব আমাদের মনে করিয়ে দেয়। প্রতিনিয়ত এই সূরার শিক্ষা গ্রহণ করলে, একজন মুসলিম তার ইমানকে শক্তিশালী করতে পারে এবং দুনিয়া ও আখেরাতের কল্যাণ লাভ করতে পারে।

Continue Reading

Trending