মূল অংশে যান
সোমবার, ২ নভেম্বর ২০২৬ · ১৭ কার্তিক ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ · ২২ জমাদিউল আউয়াল ১৪৪৮ হিজরি
ব্রেকিং
মতামত

ডিসেম্বরে শেখ হাসিনার ফেরা কি বাস্তব, নাকি রাজনৈতিক বার্তা?

জাহিদ ইকবাল সিনিয়র সাংবাদিক ও সভাপতি, বাংলাদেশ অনলাইন জার্নালিস্ট অ্যাসোসিয়েশন

অলটাইম নিউজ ডেস্ক প্রকাশ: ৩১ অক্টোবর ২০২৬, ৩:২৭ অপরাহ্ণ · আপডেট: ২ নভেম্বর ২০২৬, ২:১১ অপরাহ্ণ · ৫ মিনিটে পড়ুন
ডিসেম্বরে শেখ হাসিনার ফেরা কি বাস্তব, নাকি রাজনৈতিক বার্তা?
ক্ষমতাচ্যুত প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা

একটি বিমানবন্দর, একটি টিকিট আর একটি ঘোষণা—ডিসেম্বরে দেশে ফিরবেন শেখ হাসিনা। এমনটাই জানিয়েছেন ক্ষমতাচ্যুত এই প্রধানমন্ত্রী। কিন্তু তাঁর ফেরার পক্ষে এখন পর্যন্ত দৃশ্যমান কোনো প্রস্তুতি নেই। যিনি একসময় রাষ্ট্রের সর্বোচ্চ ক্ষমতায় ছিলেন, তিনি এখন বিদেশে অবস্থান করছেন মৃত্যুদণ্ডের রায় মাথায় নিয়ে। তাই প্রশ্নটি কেবল তাঁর দেশে ফেরার নয়; বরং এই ঘোষণা বাস্তবে রূপ নেওয়ার সম্ভাবনা কতটুকু, সেটিই এখন আলোচনার বিষয়।

রাজনীতিতে অনেক ঘোষণা দেওয়া হয়, যার সবকিছু শেষ পর্যন্ত বাস্তবায়িত হয় না। তবে দেশ ছেড়ে যাওয়া একজন সাবেক প্রধানমন্ত্রীর পক্ষ থেকে এমন ঘোষণা এলে তা উপেক্ষা করার সুযোগ নেই।

রয়টার্সকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে হাসিনা জানিয়েছেন, ডিসেম্বরের দিকে দেশে ফিরে আদালতে আত্মসমর্পণ করবেন। তাঁর সঙ্গে আওয়ামী লীগের জ্যেষ্ঠ নেতারাও আত্মসমর্পণ করবেন বলে দাবি করেছেন তিনি। পরে এক অডিও বক্তব্যেও একই কথা বলেন। সেখানে তাঁর বক্তব্য ছিল, মৃত্যুদণ্ডের আশঙ্কা থাকলেও স্বেচ্ছায় দেশে ফেরা তাঁর দায়িত্ব।

কথাগুলো শুনতে সাহসী সিদ্ধান্তের মতো মনে হতে পারে। কিন্তু সাহস আর বাস্তব পরিকল্পনা এক বিষয় নয়। আত্মসমর্পণের মতো গুরুতর সিদ্ধান্তের জন্য আইনি প্রস্তুতি, আইনজীবীদের সঙ্গে আলোচনা, নিরাপত্তা এবং আদালতকেন্দ্রিক প্রক্রিয়া সম্পর্কে আগাম পরিকল্পনা থাকা প্রয়োজন। একই সঙ্গে বিবেচনায় রাখতে হয় ফেরার পথের কূটনৈতিক বাস্তবতাও।

হাসিনা নিজেই জানিয়েছেন, দেশে ফেরার সময় নিয়ে কোনো বিদেশি সরকারের সঙ্গে তাঁর আলোচনা হয়নি। ঢাকার কর্তৃপক্ষের সঙ্গেও যোগাযোগ হয়নি। প্রথম আলোর এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, দৃশ্যমান প্রস্তুতি ও রাজনৈতিক সমঝোতার অভাবে আওয়ামী লীগের নেতাদের মধ্যেও তাঁর ঘোষণার বাস্তবায়ন নিয়ে সংশয় রয়েছে। দলের ভেতরেই যদি এমন অনিশ্চয়তা থাকে, তাহলে সাধারণ মানুষের মনে প্রশ্ন ওঠা অস্বাভাবিক নয়।

এই প্রশ্নগুলোর পেছনে রয়েছে ২০২৪ সালের জুলাই-আগস্টের ভয়াবহ ঘটনাপ্রবাহ। ছাত্রদের কোটা সংস্কার আন্দোলন একপর্যায়ে সরকার পতনের আন্দোলনে রূপ নেয়। ওই সময়ে প্রাণ হারান বহু মানুষ।

জাতিসংঘের মানবাধিকার দপ্তরের তদন্ত প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ১৫ জুলাই থেকে ৫ আগস্টের মধ্যে বিভিন্ন বিশ্বাসযোগ্য সূত্রের তথ্য অনুযায়ী, নিহতের সংখ্যা ১ হাজার ৪০০ পর্যন্ত হতে পারে। প্রতিবেদনে আরও গুরুতর অভিযোগ করা হয়েছে যে নিহত ও আহতদের বড় একটি অংশ নিরাপত্তা বাহিনীর গুলিতে হতাহত হয়েছেন এবং উচ্চপর্যায় থেকে প্রাণঘাতী বলপ্রয়োগের নির্দেশ এসেছিল।

এর ধারাবাহিকতায় ২০২৫ সালের ১৭ নভেম্বর আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল মানবতাবিরোধী অপরাধের দায়ে শেখ হাসিনাকে মৃত্যুদণ্ড দেন। একই মামলায় সাবেক স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খানকেও দণ্ড দেওয়া হয়।

রায়ের পর অন্তর্বর্তী সরকার ভারতের কাছে শেখ হাসিনাকে প্রত্যর্পণের অনুরোধ জানায়। নয়াদিল্লি অনুরোধ পাওয়ার বিষয়টি স্বীকার করলেও এখনো তাঁকে হস্তান্তর করেনি। জুলাই মাসেও ভারত জানিয়েছিল, বিষয়টি তাদের বিবেচনাধীন রয়েছে।

বাংলাদেশ ও ভারতের মধ্যে ২০১৩ সালের প্রত্যর্পণ চুক্তি থাকলেও বিষয়টি শুধু আইনি প্রক্রিয়ার মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়; এর সঙ্গে জড়িয়ে রয়েছে রাজনৈতিক ও কূটনৈতিক হিসাব-নিকাশ। ভারত বিচারপ্রক্রিয়ার বিশ্বাসযোগ্যতা নিয়ে প্রশ্ন তুলতে পারে কিংবা রায়কে রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত বলে বিবেচনা করতে পারে। ফলে প্রত্যর্পণ নিয়ে অনিশ্চয়তা সহজে কাটবে, এমনটা নিশ্চিত করে বলা যায় না।

এখানেই হাসিনার ঘোষণার সবচেয়ে বড় অসংগতি সামনে আসে। একদিকে তিনি আদালতে আত্মসমর্পণের কথা বলছেন, অন্যদিকে রায়কে আইনত অকার্যকর বলে দাবি করছেন। আত্মসমর্পণের অর্থ হলো আদালতের সামনে উপস্থিত হয়ে নিজের বক্তব্য ও অবস্থান তুলে ধরা। কিন্তু যিনি আদালতের বৈধতা নিয়েই প্রশ্ন তুলছেন, তাঁর আত্মসমর্পণের ঘোষণা কতটা আন্তরিক—সেই প্রশ্ন থেকেই যায়।

এ কারণে অনেকের কাছে ঘোষণাটি আইনি প্রস্তুতির চেয়ে রাজনৈতিক বার্তা হিসেবেই বেশি প্রতীয়মান হচ্ছে। সমর্থকদের মনোবল ধরে রাখা, দলকে সংগঠিত রাখা এবং আন্তর্জাতিক পরিসরে নিজের উপস্থিতি জানান দেওয়া এই তিনটি উদ্দেশ্য এতে কাজ করতে পারে।

তবে নিরপেক্ষ বিশ্লেষণের জন্য বিপরীত পক্ষের বক্তব্য ও যুক্তিগুলোও বিবেচনায় নেওয়া প্রয়োজন। ব্রিটিশ অনুসন্ধানী সাংবাদিক ডেভিড বার্গম্যান অনুপস্থিতিতে বিচারপ্রক্রিয়ার ধরন নিয়ে আপত্তি তুলেছেন। ন্যায্য বিচারের আন্তর্জাতিক মানদণ্ড, পূর্ববর্তী ঘটনাপ্রবাহের প্রভাব এবং মৃত্যুদণ্ডের মতো শাস্তি নিয়ে বিশ্লেষকদের মধ্যেও ট্রাইব্যুনালের কার্যক্রম সম্পর্কে প্রশ্ন রয়েছে।

অন্যদিকে আওয়ামী লীগের বক্তব্য, দলটির অনেক নেতা-কর্মী মামলা, গ্রেপ্তার ও হামলার শিকার হচ্ছেন। দলের কিছু সদস্য রাজনৈতিক অন্তর্ভুক্তির আশ্বাস পেলে দেশে ফিরতে প্রস্তুত বলেও জানা গেছে।

এসব অভিযোগের যথাযথ তদন্ত হওয়া প্রয়োজন। তবে একটি বিষয় স্পষ্ট রাখা জরুরি—শীর্ষ নেতৃত্বের বিরুদ্ধে প্রমাণের ভিত্তিতে জবাবদিহি নিশ্চিত করা এক বিষয়, আর সাধারণ কর্মী বা সমর্থকদের সামগ্রিকভাবে দায়ী করা সম্পূর্ণ ভিন্ন বিষয়। প্রথমটি ন্যায়বিচারের অংশ হতে পারে, কিন্তু দ্বিতীয়টি নতুন অবিচারের জন্ম দিতে পারে।

দেশে ফিরলে কী নিশ্চিত করা প্রয়োজন?

ডিসেম্বরে হাসিনা সত্যিই দেশে ফিরলে কয়েকটি বিষয়কে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিতে হবে। প্রথমত, তাঁর উপস্থিতিতে আপিল বা পুনর্বিচারের সুযোগ নিশ্চিত করা প্রয়োজন। অনুপস্থিতিতে দেওয়া রায়ের সম্ভাব্য ত্রুটি দূর করার সবচেয়ে বিশ্বাসযোগ্য উপায় হতে পারে এটি। এতে রায়ের নৈতিক গ্রহণযোগ্যতাও বাড়বে।

দ্বিতীয়ত, বিচারপ্রক্রিয়ায় স্বাধীন আন্তর্জাতিক পর্যবেক্ষকদের উপস্থিতি নিশ্চিত করা যেতে পারে। এতে বিচারপ্রক্রিয়ার স্বচ্ছতা বাড়বে এবং রায়ের ফলাফল যা-ই হোক, প্রক্রিয়া নিয়ে প্রশ্ন তোলার সুযোগ কমবে।

তৃতীয়ত, হতাহতের সংখ্যা নিয়ে বিতর্কের অবসানে স্বচ্ছ ও যাচাইযোগ্য তালিকা প্রকাশ করা জরুরি। এতে কোনো পক্ষই তথ্যের অভাবকে অজুহাত হিসেবে ব্যবহার করতে পারবে না। একই সঙ্গে ভুক্তভোগী পরিবারগুলোর জন্য ক্ষতিপূরণ এবং প্রকৃত ঘটনা উদ্ঘাটনে পৃথক উদ্যোগ নেওয়া প্রয়োজন। কারণ বিচার নিশ্চিত করার পাশাপাশি ভুক্তভোগীদের স্বীকৃতি দেওয়াও জরুরি।

সবশেষে, ভারতের সঙ্গে আইনি ও কূটনৈতিক যোগাযোগ অব্যাহত রাখতে হবে, যাতে প্রত্যর্পণের প্রশ্ন দুই দেশের অন্যান্য সম্পর্কের ওপর নেতিবাচক প্রভাব না ফেলে।

যাঁরা বাংলাদেশের রাজনীতি কাছ থেকে দেখেছেন, তাঁরা জানেন, প্রতিটি বড় রাজনৈতিক ঘটনার পর সাধারণত দুটি পক্ষ তৈরি হয়। এক পক্ষ হাসিনার ফেরাকে অন্যায়ের বিরুদ্ধে সাহসী প্রতিবাদ হিসেবে দেখছে। অন্য পক্ষ মনে করছে, এটি বিচার এড়ানোর কৌশল হতে পারে।

কিন্তু এই দুই অবস্থানের মাঝখানে রয়েছেন দেশের সাধারণ মানুষ। তাঁদের প্রত্যাশা খুবই সাধারণ—নিরাপদ জীবন, সত্যের স্বীকৃতি এবং এমন একটি রাষ্ট্র, যেখানে ক্ষমতা হারানোর পর কেউ জবাবদিহি এড়াতে পারবেন না; আবার ক্ষমতায় থাকলেও কেউ নিরঙ্কুশ ক্ষমতার অধিকারী হবেন না।

এই প্রত্যাশা কোনো নির্দিষ্ট রাজনৈতিক দলের নয়, বরং সমগ্র জাতির।

ডিসেম্বরে শেখ হাসিনা সত্যিই দেশে ফিরবেন কি না, তা এখনই নিশ্চিত করে বলা সম্ভব নয়। যে বিষয়ে এত অনিশ্চয়তা রয়েছে, তা নিয়ে জোর দিয়ে ভবিষ্যদ্বাণী করাও দায়িত্বশীলতার পরিচয় নয়। তবে দৃশ্যমান প্রস্তুতির অভাব, ভারতের নীরবতা এবং তাঁর ঘোষণার ভেতরের অসংগতি বিবেচনায় নিলে দেশে ফেরার বিষয়টি এখনো অনিশ্চিত বলেই প্রতীয়মান হয়।

তবে এর চেয়েও বড় প্রশ্ন হলো, বাংলাদেশ কি এমন একটি বিচারব্যবস্থা গড়ে তুলতে পারবে, যা প্রতিশোধ নয়, বরং প্রমাণের ভিত্তিতে পরিচালিত হবে?

নিহতদের পরিবার যদি ন্যায়বিচার পায় এবং অভিযুক্ত ব্যক্তি যদি ন্যায্য শুনানির সুযোগ পান, তাহলেই দেশের মানুষ বিশ্বাস করতে পারবে—ক্ষমতার অপব্যবহারের জবাব একদিন দিতেই হয়। ডিসেম্বর আসুক কিংবা না আসুক, সেই পরীক্ষার সূচনা অনেক আগেই হয়ে গেছে।