এইচএসসির ফল বিপর্যয়: শিক্ষাব্যবস্থার দুর্বলতা কাটবে কবে?
সম্পাদকীয়
বিশেষ প্রতিবেদক
চলতি বছরের এইচএসসি ও সমমান পরীক্ষার ফল উচ্চমাধ্যমিক শিক্ষাব্যবস্থার দুর্বলতা আবারও সামনে এনেছে। গত ২২ বছরের মধ্যে সর্বনিম্ন পাসের হার এবং প্রায় ছয় লাখ শিক্ষার্থীর অকৃতকার্য হওয়ার ঘটনা শিক্ষার মান নিয়ে গভীর উদ্বেগ তৈরি করেছে। এ পরিস্থিতি থেকে উত্তরণে শিক্ষাব্যবস্থার বিদ্যমান সমস্যাগুলো চিহ্নিত করে কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়ার তাগিদ রয়েছে।
প্রকাশিত ফল অনুযায়ী, এ বছর এইচএসসি ও সমমান পরীক্ষায় পাসের হার ৫২ দশমিক ১২ শতাংশ। এর আগে ২০০৪ সালে পাসের হার ছিল ৪৭ দশমিক ৭৪ শতাংশ। এবার মোট ১২ লাখ ৪০ হাজার ৯৭৮ শিক্ষার্থী পরীক্ষায় অংশ নিয়ে উত্তীর্ণ হয়েছেন ৬ লাখ ৪৬ হাজার ৬৮৫ জন। অকৃতকার্য হয়েছেন ৫ লাখ ৯৪ হাজার ১১৩ জন।
গত বছরের তুলনায় এবার পাসের হার কমেছে ৬ দশমিক ৭১ শতাংশ। ২০২৫ সালে গড় পাসের হার ছিল ৫৮ দশমিক ৮৩ শতাংশ। একই সঙ্গে কমেছে জিপিএ-৫ পাওয়া শিক্ষার্থীর সংখ্যাও। গত বছর ৭২ হাজার ১৭৬ জন জিপিএ-৫ পেলেও এবার পেয়েছেন ৪০ হাজার ৮৪ জন। অর্থাৎ এক বছরের ব্যবধানে জিপিএ-৫ প্রাপ্ত শিক্ষার্থীর সংখ্যা কমেছে ৩২ হাজার ৯২ জন।
শূন্য পাসের প্রতিষ্ঠানের সংখ্যা বেড়েছে
ফলাফলের আরেকটি উদ্বেগজনক দিক হলো, ২৯৩টি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের কোনো শিক্ষার্থীই পাস করতে পারেননি। গত বছর এ ধরনের প্রতিষ্ঠানের সংখ্যা ছিল ২০২টি। অর্থাৎ এক বছরে শূন্য পাসের প্রতিষ্ঠানের সংখ্যা বেড়েছে ৯১টি।
অন্যদিকে, এবার ১৩৯টি প্রতিষ্ঠানে শতভাগ শিক্ষার্থী উত্তীর্ণ হয়েছেন। গত বছর এ সংখ্যা ছিল ৩৪৫। সে হিসাবে শতভাগ পাস করা প্রতিষ্ঠানের সংখ্যা কমেছে ২০৬টি।
এ পরিস্থিতিতে প্রশ্ন উঠেছে, এতসংখ্যক প্রতিষ্ঠানে কোনো শিক্ষার্থী উত্তীর্ণ না হওয়ার পেছনে কী কারণ রয়েছে এবং সরকারি অর্থে পরিচালিত এমপিওভুক্ত শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোর কার্যক্রম যথাযথভাবে তদারক করা হচ্ছে কি না।
ইংরেজি ও আইসিটিতে বড় ধস
এবারের পরীক্ষায় ইংরেজি এবং তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি (আইসিটি) বিষয়ে শিক্ষার্থীদের ফল বিশেষভাবে উদ্বেগজনক। এ দুই বিষয়ে মোট ৩ লাখ ৮২ হাজার ২১ পরীক্ষার্থী অকৃতকার্য হয়েছেন। এর মধ্যে ইংরেজিতে ২ লাখ ৪৩ হাজার ৫২৮ জন এবং আইসিটিতে ১ লাখ ৩৮ হাজার ৪৯৩ জন ফেল করেছেন।
বিশ্বায়নের যুগে ইংরেজি ভাষা ও প্রযুক্তিগত দক্ষতা শিক্ষা এবং কর্মজীবনের জন্য গুরুত্বপূর্ণ। এমন দুটি বিষয়ে বিপুলসংখ্যক শিক্ষার্থীর অকৃতকার্য হওয়া শ্রেণিকক্ষের পাঠদান, বিষয়ভিত্তিক দক্ষতা অর্জন এবং শিক্ষার্থীদের শিখন পরিস্থিতি নিয়ে প্রশ্ন তৈরি করেছে।
শিখন ঘাটতি ও শিক্ষক সংকট কতটা দায়ী?
বিশেষজ্ঞরা ফল বিপর্যয়ের পেছনে শিক্ষার্থীদের শিখন ঘাটতি, শিক্ষক সংকট, বিষয়ভিত্তিক পর্যাপ্ত শিক্ষক না থাকা, মূল্যায়ন পদ্ধতির সীমাবদ্ধতা এবং সামগ্রিক শিক্ষাব্যবস্থার দুর্বলতাকে দায়ী করেছেন। শিক্ষামন্ত্রী আ ন ম এহছানুল হক মিলনও শিক্ষার্থীদের শিখন ঘাটতির বিষয়টি স্বীকার করেছেন।
তবে সমস্যাটি শুধু উচ্চমাধ্যমিক পর্যায়ে সীমাবদ্ধ নয়। প্রাথমিক ও মাধ্যমিক স্তরে প্রয়োজনীয় জ্ঞান ও দক্ষতা অর্জন না করেই অনেক শিক্ষার্থী পরবর্তী শ্রেণিতে উত্তীর্ণ হচ্ছে। ফলে আগের স্তরের দুর্বলতা উচ্চমাধ্যমিকে এসে আরও স্পষ্ট হয়ে উঠছে।
প্রয়োজন কার্যকর ও দীর্ঘমেয়াদি উদ্যোগ
এইচএসসির এমন ফল কোনোভাবেই প্রত্যাশিত নয়। বিশেষ করে প্রায় ৩০০ প্রতিষ্ঠানে শূন্য পাসের হার এবং ইংরেজি ও আইসিটিতে ব্যাপক অকৃতকার্যতার বিষয়গুলো গুরুত্বের সঙ্গে পর্যালোচনা করা প্রয়োজন।
শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোর পাঠদানের মান, শিক্ষক নিয়োগ ও উপস্থিতি, বিষয়ভিত্তিক দক্ষতা, শিক্ষার্থীদের নিয়মিত মূল্যায়ন এবং শিখন ঘাটতি দূর করার কার্যক্রম খতিয়ে দেখা জরুরি। পাশাপাশি প্রাথমিক ও মাধ্যমিক পর্যায় থেকেই শিক্ষার্থীদের মৌলিক জ্ঞান ও দক্ষতা নিশ্চিত করতে হবে।
শিক্ষার মানোন্নয়নে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের দ্রুত ও সমন্বিত উদ্যোগ প্রয়োজন। সমস্যার প্রকৃত কারণ শনাক্ত করে কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়া না হলে ভবিষ্যতে শিক্ষার পরিস্থিতি আরও অবনতির দিকে যেতে পারে।




