মূল অংশে যান
সোমবার, ২ নভেম্বর ২০২৬ · ১৭ কার্তিক ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ · ২২ জমাদিউল আউয়াল ১৪৪৮ হিজরি
ব্রেকিং
আন্তর্জাতিক

সৌদি আরবের যুদ্ধে কি সরাসরি জড়াবে পাকিস্তান?

দ্য ডিপ্লোম্যাটের বিশ্লেষণ

অলটাইম নিউজ ডেস্ক প্রকাশ: ৩০ অক্টোবর ২০২৬, ১:১৩ পূর্বাহ্ণ · আপডেট: ২ নভেম্বর ২০২৬, ৫:০৬ পূর্বাহ্ণ · ৩ মিনিটে পড়ুন
সৌদি আরবের যুদ্ধে কি সরাসরি জড়াবে পাকিস্তান?
ছবি: সংগৃহীত

মধ্যপ্রাচ্যের চলমান সংঘাতের মধ্যে সৌদি আরবের সঙ্গে পাকিস্তানের প্রতিরক্ষা সহযোগিতা নতুন করে আলোচনায় এসেছে। রিয়াদের নিরাপত্তা নিশ্চিতে ইসলামাবাদ কতটা এগোবে, বিশেষ করে হুথিদের বিরুদ্ধে চলমান সংঘাতে পাকিস্তানি বাহিনী সরাসরি অংশ নেবে কি না—এখন সেই প্রশ্নই সামনে এসেছে।

‘দ্য ডিপ্লোম্যাট’-এ প্রকাশিত এক বিশ্লেষণে বলা হয়েছে, সৌদি আরবের নিরাপত্তার প্রতি পাকিস্তানের অঙ্গীকার থাকলেও ইসলামাবাদ আপাতত সরাসরি যুদ্ধের পরিবর্তে সহায়ক ভূমিকায় থাকার চেষ্টা করছে।

সৌদি আরব ও পাকিস্তানের সামরিক সম্পর্ক অবশ্য নতুন নয়। ১৯৬০-এর দশক থেকেই সৌদি সেনাবাহিনীকে প্রশিক্ষণ ও সামরিক পরামর্শ দিয়ে আসছেন পাকিস্তানি কর্মকর্তারা। ১৯৮২ সালে দুই দেশের নিরাপত্তা সহযোগিতা আনুষ্ঠানিক রূপ পায়। উপসাগরীয় যুদ্ধের সময়ও সৌদি আরবের নিরাপত্তায় পাকিস্তানি সেনা মোতায়েন করা হয়েছিল।

তবে দীর্ঘ সামরিক সম্পর্ক থাকলেও সৌদি আরবের সব সামরিক অভিযানে সরাসরি অংশ নেয়নি পাকিস্তান। ২০১৫ সালে ইয়েমেনে সৌদি নেতৃত্বাধীন জোটের অভিযানে যোগ দেওয়ার বিষয়েও পাকিস্তানের পার্লামেন্ট নিরপেক্ষ থাকার পক্ষে অবস্থান নেয়। পরবর্তী সময়ে সৌদি আরবে পাকিস্তানি সেনা মোতায়েন করা হলেও তাদের দায়িত্ব মূলত প্রশিক্ষণ, পরামর্শ ও প্রতিরক্ষামূলক কার্যক্রমে সীমিত ছিল।

নতুন প্রতিরক্ষা চুক্তিতে বাড়ছে চাপ

২০২৫ সালের সেপ্টেম্বরে সৌদি আরব ও পাকিস্তানের মধ্যে কৌশলগত পারস্পরিক প্রতিরক্ষা চুক্তি (এসএমডিএ) সই হয়। এর ফলে দুই দেশের নিরাপত্তা সম্পর্ক আরও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে। এরপর ২০২৬ সালের আগস্টে তুরস্ক, সৌদি আরব ও পাকিস্তানের মধ্যে স্বাক্ষরিত মক্কা চুক্তিও আঞ্চলিক প্রতিরক্ষা সমীকরণে নতুন মাত্রা যোগ করে।

‘দ্য ডিপ্লোম্যাট’-এর বিশ্লেষণ বলছে, সৌদি আরবের ওপর হুথিদের হামলা বাড়তে থাকায় গত ৫ অক্টোবর পাকিস্তান ও তুরস্ক সৌদি আরবের সঙ্গে নিরাপত্তা সহযোগিতায় যুক্ত হওয়ার বিষয়ে সম্মত হয়। তবে পাকিস্তানের অবস্থান এখনো সরাসরি শত্রুপক্ষের ভূখণ্ডে অভিযান চালানোর চেয়ে সৌদি বাহিনীকে সহায়তা করার দিকেই বেশি।

পাকিস্তানের প্রতিরক্ষামন্ত্রী খাজা আসিফও জানিয়েছেন, পাকিস্তান ও তুরস্ক সহায়ক ভূমিকা পালন করছে। গোয়েন্দা নজরদারিসহ বিভিন্ন কার্যক্রমে পাকিস্তানের সম্পৃক্ততা থাকলেও সরাসরি লড়াইয়ের দায়িত্ব মূলত সৌদি বাহিনীর ওপরই রয়েছে।

সরাসরি যুদ্ধে জড়াতে কেন দ্বিধা?

সৌদি আরবের নিরাপত্তায় অঙ্গীকার থাকলেও সরাসরি যুদ্ধে জড়ানোর ক্ষেত্রে পাকিস্তানের সামনে বেশ কিছু কৌশলগত বাধা রয়েছে।

এর মধ্যে অন্যতম ইরান। পাকিস্তানের পশ্চিম সীমান্তে ইরানের সঙ্গে প্রায় ৯০০ কিলোমিটার সীমান্ত রয়েছে। হুথিদের সঙ্গে তেহরানের ঘনিষ্ঠতার কারণে সৌদি নেতৃত্বাধীন কোনো সামরিক অভিযানে পাকিস্তান সরাসরি অংশ নিলে ইরানের সঙ্গে তাদের সম্পর্ক আরও জটিল হয়ে উঠতে পারে।

অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক বাস্তবতাও ইসলামাবাদের জন্য গুরুত্বপূর্ণ। পাকিস্তানের জনসংখ্যার একটি উল্লেখযোগ্য অংশ শিয়া মুসলিম হওয়ায় ইরানবিরোধী কোনো সামরিক অবস্থান দেশের অভ্যন্তরে রাজনৈতিক ও সামাজিক প্রতিক্রিয়া তৈরি করতে পারে।

এর সঙ্গে রয়েছে আফগানিস্তান ও ভারতের সঙ্গে পাকিস্তানের নিজস্ব নিরাপত্তা চ্যালেঞ্জ। এসব সীমান্তে চাপ থাকা অবস্থায় মধ্যপ্রাচ্যে দীর্ঘমেয়াদি সামরিক সংঘাতে জড়িয়ে পড়া পাকিস্তানের জন্য বাড়তি ঝুঁকি তৈরি করতে পারে।

তবে অন্যদিকে সৌদি আরবের আর্থিক সহায়তা ও বিনিয়োগ পাকিস্তানের অর্থনীতির জন্য গুরুত্বপূর্ণ। ফলে রিয়াদের নিরাপত্তা-চাহিদা পুরোপুরি উপেক্ষা করাও ইসলামাবাদের জন্য সহজ নয়।

আবার সৌদি আরব পাকিস্তানের ঘনিষ্ঠ মিত্র হলেও ভবিষ্যতে ভারতের সঙ্গে কোনো সংঘাত হলে রিয়াদ একই মাত্রায় পাকিস্তানের পাশে সামরিক বা কূটনৈতিকভাবে থাকবে—এমন নিশ্চয়তাও নেই বলে বিশ্লেষণে উল্লেখ করা হয়েছে।

শেষ পর্যন্ত কোন পথে যাবে ইসলামাবাদ?

সব মিলিয়ে সৌদি আরবের নিরাপত্তায় পাকিস্তানের ভূমিকা বাড়লেও সরাসরি যুদ্ধক্ষেত্রে নামার বিষয়টি এখনো অনিশ্চিত। একদিকে রিয়াদের সঙ্গে প্রতিরক্ষা অঙ্গীকার, অন্যদিকে ইরানের সঙ্গে সম্পর্ক, অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক বাস্তবতা, নিজস্ব সীমান্ত নিরাপত্তা এবং অর্থনৈতিক স্বার্থ—সবকিছু বিবেচনায় নিয়েই সিদ্ধান্ত নিতে হবে ইসলামাবাদকে।

তাই পাকিস্তান শেষ পর্যন্ত সৌদি আরবের যুদ্ধে কতটা সরাসরি জড়াবে, তা নির্ভর করবে সংঘাত কোন দিকে গড়ায় এবং সৌদি-পাকিস্তান প্রতিরক্ষা অঙ্গীকার বাস্তবে কীভাবে প্রয়োগ করা হয়, তার ওপর।