ট্রাম্পের জনপ্রিয়তায় ধস, বিশ্বজুড়ে কমছে ‘ট্রাম্প মডেল’-এর প্রভাব?
সাম্প্রতিক জরিপে ট্রাম্পের অনুমোদন ৩২ শতাংশে নেমে এসেছে। যা তার দুই মেয়াদের মধ্যে সর্বনিম্ন।
মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের রাজনৈতিক ভবিষ্যৎ নিয়ে নতুন করে প্রশ্ন উঠেছে। আগামী ৩ নভেম্বরের মধ্যবর্তী নির্বাচনে রিপাবলিকানরা প্রত্যাশিত ফল করতে না পারলে তা ট্রাম্পের জন্য বড় রাজনৈতিক ধাক্কা হয়ে উঠতে পারে। বিশেষ করে জীবনযাত্রার ব্যয়, মূল্যস্ফীতি ও জ্বালানির দাম নিয়ে ভোটারদের অসন্তোষ তার জনপ্রিয়তায় প্রভাব ফেলছে।
সাম্প্রতিক Reuters/Ipsos জরিপে ট্রাম্পের অনুমোদন ৩২ শতাংশে নেমে এসেছে। গত সপ্তাহে তা ছিল ৩১ শতাংশ, যা ছিল তার দুই মেয়াদের মধ্যে সর্বনিম্ন। অন্যদিকে AP-NORC-এর অক্টোবরের জরিপে ট্রাম্পের চাকরির প্রতি অনুমোদন পাওয়া গেছে ৩৬ শতাংশ ভোটারের। অর্থাৎ জরিপভেদে তার জনসমর্থন এখন ৩০ শতাংশের ঘরে।
মধ্যবর্তী নির্বাচনে কংগ্রেসের নিয়ন্ত্রণ নিয়েও রিপাবলিকানদের জন্য স্বস্তির খবর নেই। Reuters/Ipsos-এর সর্বশেষ জরিপে নিবন্ধিত ভোটারদের মধ্যে ডেমোক্র্যাটদের পক্ষে ৪৭ শতাংশ এবং রিপাবলিকানদের পক্ষে ৩৬ শতাংশ সমর্থন পাওয়া গেছে। অনিশ্চিত ভোটারদের সম্ভাব্য পছন্দ হিসাব করলে ব্যবধান দাঁড়ায় ৫০-৪১ শতাংশে। সম্ভাব্য ভোটারদের মধ্যেও ডেমোক্র্যাটরা ৫৩-৪৪ শতাংশ ব্যবধানে এগিয়ে।
তবে এই নির্বাচন শুধু ট্রাম্পের রাজনৈতিক অবস্থান নির্ধারণ করবে না। ২০১৬ সালে তার উত্থানের মধ্য দিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের বাইরে যে জাতীয়তাবাদী ও জনতুষ্টিবাদী রাজনীতি নতুন গতি পেয়েছিল, সেই ধারার ভবিষ্যৎ নিয়েও প্রশ্ন তৈরি হয়েছে।
অর্থনীতি ও জীবনযাত্রার ব্যয় বড় চাপ
ট্রাম্পের জনপ্রিয়তা কমার অন্যতম কারণ অর্থনৈতিক পরিস্থিতি। নির্বাচনের আগে জীবনযাত্রার ব্যয় কমানো ও অর্থনীতি শক্তিশালী করার প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন তিনি। কিন্তু এখনো বিপুলসংখ্যক মার্কিন ভোটার অর্থনৈতিক পরিস্থিতি নিয়ে অসন্তুষ্ট।
AP-NORC-এর অক্টোবরের জরিপে ৭৪ শতাংশ ভোটার বলেছেন, অর্থনীতি পরিচালনায় ট্রাম্পের প্রতি তারা অসন্তুষ্ট। জীবনযাত্রার ব্যয় সামাল দেওয়ার ক্ষেত্রেও ৭৯ শতাংশ ভোটারের নেতিবাচক মনোভাব রয়েছে। একই জরিপে প্রায় অর্ধেক ভোটার বলেছেন, কংগ্রেসের নিয়ন্ত্রণ ডেমোক্র্যাটদের হাতে দেখতে চান।
Reuters/Ipsos-এর সাম্প্রতিক জরিপেও একই প্রবণতা দেখা গেছে। ৭৩ শতাংশ ভোটার বলেছেন, তাদের জীবনযাত্রার ব্যয় ভুল দিকে যাচ্ছে। অর্থনীতি পরিচালনায় ডেমোক্র্যাটদের পক্ষে ৩৭ শতাংশ এবং রিপাবলিকানদের পক্ষে ৩৩ শতাংশ ভোটারের আস্থা রয়েছে।
ইরানের সঙ্গে চলমান সংঘাতও পরিস্থিতিকে আরও জটিল করেছে। সামরিক সংঘাতের পর জ্বালানির দাম বেড়ে যাওয়ায় মার্কিন পরিবারের ওপর বাড়তি ব্যয়ের চাপ তৈরি হয়েছে। ফলে অর্থনীতি ও মূল্যস্ফীতি এবারের মধ্যবর্তী নির্বাচনের অন্যতম প্রধান ইস্যুতে পরিণত হয়েছে।
তবে ট্রাম্পের দুর্বল অবস্থানকে ডেমোক্র্যাটদের ব্যাপক জনপ্রিয়তার প্রমাণ হিসেবে দেখার সুযোগ নেই। AP-NORC জরিপে ডেমোক্র্যাটিক পার্টির প্রতি ইতিবাচক মনোভাব রয়েছে ৪০ শতাংশ ভোটারের। ফলে ট্রাম্পবিরোধী অসন্তোষকে নিজেদের পক্ষে ভোটে রূপান্তর করাও ডেমোক্র্যাটদের জন্য বড় চ্যালেঞ্জ।
ইউরোপেও চাপে ‘ট্রাম্প মডেল’
ট্রাম্পের রাজনৈতিক কৌশলের প্রভাব শুধু যুক্তরাষ্ট্রে সীমাবদ্ধ থাকেনি। জাতীয়তাবাদ, অভিবাসন নিয়ন্ত্রণ, প্রচলিত রাজনৈতিক ব্যবস্থার সমালোচনা এবং ‘নিজ দেশের স্বার্থ আগে’—এই ধারণাগুলো ইউরোপের বিভিন্ন ডানপন্থি ও জনতুষ্টিবাদী রাজনীতিকের বক্তব্যেও দেখা গেছে।
যুক্তরাজ্যের রিফর্ম ইউকে দলের নেতা নাইজেল ফারাজ এ ক্ষেত্রে অন্যতম পরিচিত নাম। ব্রেক্সিট আন্দোলনের অন্যতম মুখ ফারাজ দীর্ঘদিন ধরে অভিবাসন নিয়ন্ত্রণ ও জাতীয়তাবাদী রাজনীতিকে গুরুত্ব দিয়ে আসছেন। তার রাজনৈতিক বক্তব্যের সঙ্গে ট্রাম্পের ‘আমেরিকা ফার্স্ট’ নীতির বেশ কিছু মিল রয়েছে।
তবে সাম্প্রতিক সময়ে রিফর্ম ইউকের জনসমর্থনে কিছুটা পরিবর্তন দেখা গেছে। ২০২৬ সালের আগস্টে Ipsos-এর জরিপে দলটির সমর্থন ২৫ শতাংশে নেমে যায়, যেখানে লেবার পার্টি ২৮ শতাংশ সমর্থন নিয়ে এগিয়ে ছিল। Ipsos-এর বিশ্লেষণে বলা হয়, এক বছর আগের তুলনায় রিফর্ম ইউকের রাজনৈতিক গতি কিছুটা থমকে গেছে এবং ফারাজের নেতৃত্ব নিয়েও প্রশ্ন উঠছে।
তবে ইউরোপের সামগ্রিক চিত্র একমুখী নয়। ফ্রান্সে মেরিন লে পেনের ন্যাশনাল র্যালি এখনো গুরুত্বপূর্ণ রাজনৈতিক শক্তি। ফলে ইউরোপে ট্রাম্পের রাজনৈতিক মডেল পুরোপুরি জনপ্রিয়তা হারিয়েছে—এমন সিদ্ধান্তে পৌঁছানো কঠিন।
বরং দেশভেদে এর ফলাফল ভিন্ন। কোথাও জাতীয়তাবাদী ও জনতুষ্টিবাদী দলগুলোর সমর্থন কমছে, আবার কোথাও তারা এখনো প্রচলিত রাজনৈতিক দলগুলোর জন্য বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে আছে।
যে রাজনীতি বদলে দিয়েছিল যুক্তরাষ্ট্রকে
২০১৬ সালে প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে জয়ী হওয়ার পর ট্রাম্প যুক্তরাষ্ট্রের রাজনৈতিক পরিসরে বড় পরিবর্তন আনেন। প্রচলিত রাজনৈতিক প্রতিষ্ঠান ও নেতৃত্বের সমালোচনা, জাতীয় স্বার্থকে অগ্রাধিকার এবং বৈশ্বিক সহযোগিতার বদলে দ্বিপক্ষীয় দর-কষাকষিকে গুরুত্ব দেওয়া তার রাজনীতির অন্যতম বৈশিষ্ট্য হয়ে ওঠে।
‘আমেরিকা ফার্স্ট’ নীতির আওতায় আমদানি পণ্যে শুল্ক আরোপ, বাণিজ্যিক অংশীদারদের ওপর চাপ সৃষ্টি এবং বিভিন্ন আন্তর্জাতিক চুক্তি নিয়ে নতুন অবস্থান নেন তিনি। একই সঙ্গে অভিবাসন, সীমান্ত নিরাপত্তা ও জাতীয় পরিচয়ের মতো বিষয়কে রাজনৈতিক বিতর্কের কেন্দ্রে নিয়ে আসেন।
ট্রাম্পের এই কৌশল যুক্তরাষ্ট্রের বাইরেও অনেক রাজনীতিককে প্রভাবিত করে। বিভিন্ন দেশের জাতীয়তাবাদী নেতারা প্রচলিত রাজনৈতিক ব্যবস্থার সমালোচনা, অভিবাসন নিয়ন্ত্রণ এবং জাতীয় স্বার্থকে অগ্রাধিকার দেওয়ার বক্তব্যের মাধ্যমে ভোটারদের আকৃষ্ট করার চেষ্টা করেন।
কিন্তু মূল্যস্ফীতি, অর্থনৈতিক চাপ, আন্তর্জাতিক সংঘাত এবং মিত্রদের সঙ্গে টানাপোড়েনের মতো বাস্তবতা এই রাজনৈতিক কৌশলের কার্যকারিতা নিয়ে প্রশ্ন তৈরি করছে। শুধু জনপ্রিয় স্লোগান বা প্রচলিত ব্যবস্থার বিরোধিতা করে দীর্ঘমেয়াদে জনসমর্থন ধরে রাখা কতটা সম্ভব, তা নিয়েও আলোচনা বাড়ছে।
ট্রাম্পের প্রভাব কি শেষ হয়ে যাচ্ছে?
মধ্যবর্তী নির্বাচনে রিপাবলিকানরা খারাপ ফল করলেও ট্রাম্পের রাজনৈতিক প্রভাব তাৎক্ষণিকভাবে শেষ হয়ে যাওয়ার সম্ভাবনা কম। তার শক্তিশালী সমর্থকগোষ্ঠী এখনো রিপাবলিকান রাজনীতিতে গুরুত্বপূর্ণ। দলের অনেক নেতা ও নির্বাচনী কৌশলও তার রাজনৈতিক উত্তরাধিকারের সঙ্গে যুক্ত।
তবে রিপাবলিকানরা যদি কংগ্রেসের কোনো একটি বা উভয় কক্ষের নিয়ন্ত্রণ হারায়, তাহলে ট্রাম্পের দ্বিতীয় মেয়াদের বাকি দুই বছরে তার নীতিগুলো বাস্তবায়ন কঠিন হয়ে পড়তে পারে। Reuters/Ipsos-এর বিশ্লেষণেও বলা হয়েছে, কংগ্রেসের নিয়ন্ত্রণ হারালে ট্রাম্পের এজেন্ডা বাস্তবায়নে বড় বাধা তৈরি হতে পারে।
নির্বাচনের ফল খারাপ হলে রিপাবলিকান পার্টির ভবিষ্যৎ নেতৃত্ব নিয়েও আলোচনা বাড়বে। ভাইস প্রেসিডেন্ট জেডি ভ্যান্স কিংবা পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিওর মতো নেতাদের ভবিষ্যৎ ভূমিকা তখন আরও আলোচনায় আসতে পারে।
তবে ট্রাম্পের রাজনীতির ভিত্তি কেবল একজন ব্যক্তিকে ঘিরে তৈরি হয়নি। অভিবাসন, জাতীয় পরিচয়, বাণিজ্যনীতি এবং প্রচলিত রাজনৈতিক প্রতিষ্ঠানের প্রতি অনাস্থার মতো বিষয়গুলো যুক্তরাষ্ট্রের রাজনীতিতে এখনো গুরুত্বপূর্ণ। ফলে ট্রাম্পের জনপ্রিয়তা কমলেও তার রাজনৈতিক অবস্থানের পেছনে থাকা ভোটারদের আকাঙ্ক্ষা পুরোপুরি অদৃশ্য হয়ে যাবে—এমন নিশ্চয়তা নেই।
বিশ্ব রাজনীতির ক্ষেত্রেও একই কথা প্রযোজ্য। ইউরোপের বিভিন্ন দেশে জাতীয়তাবাদী ও জনতুষ্টিবাদী দলগুলোর জনপ্রিয়তা দেশভেদে ওঠানামা করছে। ফলে একটি নির্বাচন বা একজন নেতার জনপ্রিয়তার ওপর ভিত্তি করে এই রাজনৈতিক ধারার ভবিষ্যৎ নির্ধারণ করা কঠিন।
৩ নভেম্বরের মার্কিন মধ্যবর্তী নির্বাচন তাই শুধু ট্রাম্পের জন্য একটি নির্বাচনী পরীক্ষা নয়। এর ফলাফল থেকে বোঝা যেতে পারে, তার রাজনৈতিক কৌশল ও নীতির প্রতি মার্কিন ভোটারদের আস্থা কতটা টিকে আছে। একই সঙ্গে বিশ্বজুড়ে জাতীয়তাবাদী ও জনতুষ্টিবাদী রাজনীতির ভবিষ্যৎ নিয়েও নতুন হিসাব শুরু হতে পারে।
তবে এখনই ‘ট্রাম্প-যুগের অবসান’ ঘোষণা করার মতো পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে কি না, তা বলা কঠিন। বরং নির্বাচনের ফলাফলের পর আরও স্পষ্ট হবে—ট্রাম্পের জনপ্রিয়তা কমছে, নাকি তার রাজনীতির প্রভাবও ধীরে ধীরে সংকুচিত হচ্ছে।
তথ্যসূত্র: রয়টার্স, অ্যাসোসিয়েটেড প্রেস (এপি), এপি-এনওআরসি সেন্টার ফর পাবলিক অ্যাফেয়ার্স রিসার্চ, রয়টার্স/ইপসোস ও আইপসস।







