মূল অংশে যান
শুক্রবার, ৬ নভেম্বর ২০২৬ · ২১ কার্তিক ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ · ২৬ জমাদিউল আউয়াল ১৪৪৮ হিজরি ✍️ Blog / Citizen Journalism👤 লগইন
ব্রেকিং
জাতীয়

ক্ষমতার পালাবদল হলেও বদলায়নি রাজনৈতিক সহিংসতার চিত্র

দ্য ডিপ্লোম্যাটের প্রতিবেদন

অলটাইম নিউজ ডেস্ক প্রকাশ: ৬ নভেম্বর ২০২৬, ১:০০ অপরাহ্ণ · আপডেট: ৬ নভেম্বর ২০২৬, ৬:১৫ অপরাহ্ণ · ৯ মিনিটে পড়ুন
ক্ষমতার পালাবদল হলেও বদলায়নি রাজনৈতিক সহিংসতার চিত্র
ছবি: সংগৃহীত

বাংলাদেশে একের পর এক সরকারের পরিবর্তন হলেও রাজনৈতিক সহিংসতার চিত্রে উল্লেখযোগ্য পরিবর্তন আসেনি। প্রতিদ্বন্দ্বী রাজনৈতিক দলের সংঘর্ষ, একই দলের অভ্যন্তরীণ কোন্দল এবং স্থানীয় পর্যায়ে আধিপত্য বিস্তারকে কেন্দ্র করে দীর্ঘদিন ধরেই প্রাণহানির ঘটনা ঘটছে। দ্য ডিপ্লোম্যাটের এক প্রতিবেদনে বাংলাদেশের দুই দশকের বেশি সময়ের রাজনৈতিক সহিংসতার চিত্র তুলে ধরে এ পর্যবেক্ষণ করা হয়েছে।

প্রতিবেদনে নারায়ণগঞ্জের পাইস্কা এলাকায় গত ১৮ অক্টোবর রাতে রিপন মিয়া হত্যার ঘটনা উল্লেখ করা হয়েছে। স্থানীয় যুবদল নেতা রিপনকে ধারালো অস্ত্র নিয়ে ধাওয়া করে একদল ব্যক্তি। পরে তাকে কুপিয়ে গুরুতর আহত করা হলে হাসপাতালে নেওয়ার পর চিকিৎসক মৃত ঘোষণা করেন। স্থানীয় বিএনপি কর্মীদের ভাষ্য, একটি ধর্মীয় অনুষ্ঠানের অতিথি তালিকায় কার নাম থাকবে, তা নিয়ে দুই পক্ষের বিরোধ থেকে এ হত্যাকাণ্ড ঘটে থাকতে পারে। রিপনের মেয়ে শিলা বলেন, কয়েকজন ব্যক্তি তার বাবাকে ধাওয়া করে কুপিয়েছেন। স্থানীয় বিএনপির সভাপতি হত্যাকাণ্ডের পেছনে রাজনৈতিক আধিপত্য বিস্তারের বিরোধকে দায়ী করেছেন।

চলতি বছরের ২৮ ফেব্রুয়ারি চুয়াডাঙ্গায় বিএনপি ও জামায়াতে ইসলামীর সমর্থকদের সংঘর্ষে দুই ভাই নিহত হন। পুলিশ জানায়, রমজানে ইফতারের পর কথা-কাটাকাটি থেকে সংঘর্ষের সূত্রপাত হয়। কয়েক ঘণ্টা পর হাফিজুর রহমান মারা যান। তার ভাই ও স্থানীয় জামায়াত নেতা মফিজুর রহমান ১০ মার্চ ঢাকার একটি হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় মারা যান। এ ঘটনায় বিএনপি ও জামায়াত একে অপরকে দায়ী করে। পরিবারের পক্ষ থেকে হত্যা মামলা হওয়ার পর পুলিশ তিনজনকে গ্রেপ্তার করে। তাদের মধ্যে স্থানীয় বিএনপির একজন নেতা ও দলটির স্বেচ্ছাসেবক সংগঠনের সাবেক এক নেতাও রয়েছেন। জাতীয় নির্বাচনের মাধ্যমে বিএনপি সরকার গঠনের দুই সপ্তাহেরও কম সময়ের মধ্যে এ সংঘর্ষের ঘটনা ঘটে।

দুই দশকের বেশি সময়ের সহিংসতার চিত্র

প্রতিবেদনে আইন ও সালিশ কেন্দ্রের (আসক) নথি, গবেষণা এবং সংবাদমাধ্যমে প্রকাশিত তথ্য বিশ্লেষণ করে বলা হয়েছে, ২০০২ সাল থেকে রাজনৈতিক সহিংসতার ধারাবাহিকতা রয়েছে। প্রতিদ্বন্দ্বী রাজনৈতিক দলের মধ্যে সংঘর্ষের পাশাপাশি একই দলের অভ্যন্তরীণ বিরোধ ও নির্বাচনকেন্দ্রিক সহিংসতাও বিভিন্ন সরকারের আমলে ঘটেছে।

আসকের হিসাবে, চলতি বছরের জানুয়ারি থেকে সেপ্টেম্বর পর্যন্ত রাজনৈতিক সহিংসতার ৪৬৭টি ঘটনায় ৯৪ জন নিহত এবং ৩ হাজার ৫৮৭ জন আহত হয়েছেন। এর মধ্যে বিএনপির দুই পক্ষের মধ্যে সংঘর্ষের ঘটনা ছিল ১১২টি। এসব ঘটনায় ১৮ জন নিহত এবং ১ হাজার ২১৫ জন আহত হন। এ পরিসংখ্যানে অন্তর্বর্তী সরকার ও নির্বাচিত সরকারের সময়ের ঘটনাও রয়েছে। ১৭ ফেব্রুয়ারি প্রধানমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব নেন বিএনপি চেয়ারম্যান তারেক রহমান।

প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ২০২৪ সালের গণ-অভ্যুত্থানে শেখ হাসিনা সরকারের পতন এবং পরবর্তী অন্তর্বর্তী সরকার ও জাতীয় নির্বাচনের মধ্য দিয়ে বাংলাদেশের রাজনীতিতে বড় পরিবর্তন এসেছে। তবে স্থানীয় পর্যায়ে নিয়ন্ত্রণ ও আধিপত্য প্রতিষ্ঠাকে কেন্দ্র করে সংঘর্ষ অব্যাহত রয়েছে। দলের পদ-পদবি, ব্যবসা, জমি কিংবা সামাজিক অনুষ্ঠানের অতিথি তালিকাও স্থানীয় বিরোধের কারণ হয়ে উঠছে।

শুধু বিএনপি-আওয়ামী লীগের বিরোধ নয়

বাংলাদেশের রাজনৈতিক সহিংসতাকে শুধু বিএনপি ও আওয়ামী লীগের পারস্পরিক বিরোধ দিয়ে ব্যাখ্যা করা যায় না বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। আসকের তথ্যের ভিত্তিতে রাষ্ট্রবিজ্ঞানী রওনক জাহানের ২০১৪ সালের ‘পলিটিক্যাল পার্টিজ ইন বাংলাদেশ’ গবেষণায় দেখা যায়, ২০০২ থেকে ২০০৬ সাল পর্যন্ত বিএনপির অভ্যন্তরীণ সংঘর্ষের ঘটনা ছিল ২৮৪টি। এসব ঘটনায় নিহত হন ৫৫ জন। একই সময়ে আওয়ামী লীগের অভ্যন্তরীণ সংঘর্ষে প্রাণ হারান ৩৭ জন।

২০০১ থেকে ২০০৬ সাল পর্যন্ত বিএনপি নেতৃত্বাধীন চারদলীয় জোট সরকারের শরিক ছিল জামায়াতে ইসলামী। ওই সরকারের মন্ত্রিসভায় দলটির দুজন সদস্যও ছিলেন। তবে জোটে থাকা সত্ত্বেও বিএনপি ও জামায়াতের কর্মী-সমর্থকদের মধ্যে সংঘর্ষ হয়েছে। গবেষণায় উল্লেখ করা আসকের তথ্য অনুযায়ী, ২০০২ থেকে ২০০৬ সালের মধ্যে দুই দলের মধ্যে ১৩৪টি সংঘর্ষে আটজন নিহত হন। একই সময়ে আওয়ামী লীগ ও জামায়াতের মধ্যে ৪২টি সংঘর্ষে সাতজন প্রাণ হারান।

২০০৭ ও ২০০৮ সালে সেনাসমর্থিত তত্ত্বাবধায়ক সরকারের সময় রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে সংঘর্ষের সংখ্যা কমে আসে। ওই দুই বছরে বিএনপির অভ্যন্তরীণ সংঘর্ষের ঘটনা ছিল আটটি, এতে দুজন নিহত হন। আওয়ামী লীগের অভ্যন্তরীণ সংঘর্ষের ঘটনা ছিল একটি, তবে তাতে কেউ মারা যাননি। প্রতিদ্বন্দ্বী রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে ৩২টি সংঘর্ষে নিহত হন সাতজন। সব মিলিয়ে ওই দুই বছরে রাজনৈতিক সহিংসতায় প্রাণ হারান নয়জন।

তবে সংঘর্ষ কমে যাওয়ার অর্থ রাজনৈতিক দমন-পীড়ন বন্ধ হওয়া নয়। হিউম্যান রাইটস ওয়াচের নথিতে জরুরি অবস্থার সময় নির্বিচার গ্রেপ্তার, নির্যাতন ও হেফাজতে মৃত্যুর ঘটনা উঠে এসেছে। ওই সময়ে রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডেও বিধিনিষেধ ছিল।

২০০৯ সালে আওয়ামী লীগ সরকার গঠনের পর দলটির অভ্যন্তরীণ সংঘর্ষ বেড়ে যায়। ২০০৯ থেকে ২০১২ সাল পর্যন্ত আওয়ামী লীগের অভ্যন্তরে ৭৯৯টি সংঘর্ষে ৯৭ জন নিহত হন। একই সময়ে বিএনপির অভ্যন্তরীণ সংঘর্ষের ঘটনা ছিল ২২৯টি, যাতে ২১ জন নিহত হন। প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, এসব পরিসংখ্যানের সময়সীমা দুই দলের জন্য সমান নয়। বিভিন্ন সরকারের আমলে ক্ষমতাসীন দলের অভ্যন্তরীণ সংঘর্ষ ও প্রাণহানির পুনরাবৃত্তি তুলে ধরাই এখানে মূল বিষয়।

নির্বাচন ও স্থানীয় ক্ষমতার দ্বন্দ্বে প্রাণহানি

জাতীয় পর্যায়ের রাজনৈতিক উত্তেজনা বাড়লে সহিংসতায় প্রাণহানির সংখ্যাও বেড়েছে। ২০১৩ সালে বিতর্কিত নির্বাচনকে সামনে রেখে রাজনৈতিক উত্তেজনার মধ্যে আসকের হিসাবে ৫০৭ জন নিহত হন। সংস্থাটির বার্ষিক তালিকায় হরতালকেন্দ্রিক সহিংসতায় ১৮৫ জন এবং ২৬ নভেম্বর থেকে শুরু হওয়া অবরোধ কর্মসূচিকে কেন্দ্র করে আরও ৮৫ জনের মৃত্যুর তথ্য রয়েছে।

ওই বছর জামায়াত ও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর মধ্যে সংঘর্ষও প্রাণঘাতী হয়ে ওঠে। আসকের নথিতে জামায়াত, ইসলামী ছাত্রশিবির ও পুলিশের মধ্যে সংঘর্ষে ৩৭ জন নিহত হওয়ার তথ্য রয়েছে। এ ছাড়া জামায়াত-পুলিশ সংঘর্ষের পৃথক হিসাবে আরও ১১ জনের মৃত্যুর কথা উল্লেখ করা হয়েছে। বিভিন্ন সংঘর্ষের শ্রেণিতে জামায়াত বা ছাত্রশিবিরের সংশ্লিষ্টতার তথ্য থাকলেও এসব শ্রেণি থেকে কারা মৃত্যুর জন্য দায়ী, তা নির্ধারণ করা যায় না।

পরবর্তী বছরগুলোতে জামায়াত ও ছাত্রশিবিরের নাম উল্লেখ করা সংঘর্ষের সংখ্যা কমে আসে। ২০১৫ সালে দল দুটির যেকোনো একটির নাম থাকা নয়টি ঘটনায় তিনজন নিহত হন। ২০১৬ সালে এমন দুটি সংঘর্ষে একজনের মৃত্যু হয়। ২০১৭ সালের তালিকায় শিবির-পুলিশের একটি সংঘর্ষে তিনজন আহত হওয়ার তথ্য রয়েছে। ২০১৮ ও ২০১৯ সালের তালিকায় জামায়াত বা ছাত্রশিবিরের নাম আলাদাভাবে উল্লেখ করা হয়নি।

২০১৭ সালে রাজনৈতিক সহিংসতায় ৫২ জন নিহত হন। এর মধ্যে আওয়ামী লীগের অভ্যন্তরীণ সংঘর্ষেই মারা যান ২৯ জন। স্থানীয় সরকার নির্বাচনও সহিংসতার বড় কারণ হয়ে উঠেছে। ২০১৬ সালে ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচনকে কেন্দ্র করে সহিংসতায় ১৪৭ জন নিহত হন। ওই বছর রাজনৈতিক সহিংসতায় মোট ১৭৭ জনের মৃত্যুর অধিকাংশই ছিল ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচন ঘিরে। ২০২১ সালে ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচনকেন্দ্রিক সংঘর্ষে নিহত হন ১১৩ জন। ওই বছর রাজনৈতিক সহিংসতায় মোট প্রাণহানি ছিল ১৫৭ জন।

আধিপত্য ও অর্থনৈতিক স্বার্থের দ্বন্দ্ব

ব্র্যাক ইনস্টিটিউট অব গভর্ন্যান্স অ্যান্ড ডেভেলপমেন্টের একটি গবেষণায় ২০০৮ থেকে ২০১৩ সাল পর্যন্ত প্রকাশিত রাজনৈতিক সহিংসতার ঘটনা বিশ্লেষণ করা হয়। এতে ২০০৮ থেকে ২০১২ সালের সহিংসতার অন্যতম প্রধান কারণ হিসেবে রাজনৈতিক দলগুলোর অভ্যন্তরে আধিপত্য বিস্তারের লড়াইকে চিহ্নিত করা হয়েছে। ঠিকাদারি কাজ, সম্পত্তি, জমি ও চাকরি নিয়ে বিরোধও সহিংসতার কারণ হিসেবে উঠে এসেছে।

প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, রাজনৈতিক সংগঠনের নেতৃত্ব ও পদ-পদবি নিয়ে প্রতিযোগিতা শুধু নির্বাচনে প্রভাব বিস্তারের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকে না। স্থানীয় নেতারা সরকারি সিদ্ধান্ত গ্রহণের সঙ্গে যুক্ত ব্যক্তিদের কাছে পৌঁছানোর সুযোগ পান। এ যোগাযোগ ব্যবহার করে আয় নিশ্চিত করা কিংবা ব্যবসায়িক স্বার্থ রক্ষা করা সম্ভব হলে দলীয় অভ্যন্তরীণ প্রতিযোগিতা আরও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে।

২০২৪ সালের গণ-অভ্যুত্থানের পর শেখ হাসিনা সরকারের পতন হলেও স্থানীয় পর্যায়ে ক্ষমতা ও অর্থনৈতিক স্বার্থের দ্বন্দ্ব অব্যাহত থাকে। আওয়ামী লীগ ক্ষমতা হারানোর পর দলটির নেতাকর্মীদের নিয়ন্ত্রণে থাকা বিভিন্ন পদ ও ব্যবসা-বাণিজ্য ঘিরে নতুন প্রতিযোগিতা শুরু হয়।

চট্টগ্রামে ২০২৪ সালের ২০ সেপ্টেম্বর চান্দগাঁও এলাকায় বিএনপির দুই পক্ষের সংঘর্ষে ছুরিকাঘাতে নিহত হন জুবায়ের উদ্দিন বাবু। পুলিশের ভাষ্য, একটি কৃত্রিম টার্ফ মাঠের নিয়ন্ত্রণ নিয়ে দুই পক্ষের মধ্যে বিরোধ চলছিল। চট্টগ্রামে হত্যা, হামলা, সংঘর্ষ ও জমি দখলের ১৫টি ঘটনা নিয়ে প্রথম আলোর অনুসন্ধানে পরিবহন, বাজার, জমি ও রেলওয়ের ঠিকাদারি কাজের নিয়ন্ত্রণ নিয়ে বিরোধের তথ্য উঠে আসে। প্রতিবেদনে আওয়ামী লীগের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের নিয়ন্ত্রণে থাকা বিভিন্ন নেটওয়ার্ক দখলের অভিযোগও উল্লেখ করা হয়।

আওয়ামী লীগ ক্ষমতা হারানোর পর বিএনপির অভ্যন্তরীণ সংঘর্ষ রাজনৈতিক প্রাণহানির বড় কারণ হয়ে ওঠে। আসকের হিসাবে, ২০২৫ সালে বিএনপির বিভিন্ন পক্ষের মধ্যে ১৯২টি সংঘর্ষে ৪০ জন নিহত হন। যুবদলের অভ্যন্তরীণ সংঘর্ষে মারা যান আরও আটজন। ওই বছর রাজনৈতিক সহিংসতার ৪০১টি ঘটনায় মোট ১০২ জন নিহত হওয়ার তথ্য দেয় সংস্থাটি।

এনসিপি ও বিএনপি-জামায়াত সংঘর্ষ

২০২৫ সালের ফেব্রুয়ারিতে গণ-অভ্যুত্থানে নেতৃত্ব দেওয়া ছাত্রনেতারা জাতীয় নাগরিক পার্টি (এনসিপি) গঠন করেন। তবে রাজনৈতিক সহিংসতার নথিতে দলটির সংশ্লিষ্টতাও উঠে এসেছে। আসকের হিসাবে, ২০২৫ সালে এনসিপিকে ঘিরে নয়টি সংঘর্ষের ঘটনায় পাঁচজন নিহত ও ১৭১ জন আহত হন। ২০২৬ সালের জানুয়ারি থেকে সেপ্টেম্বর পর্যন্ত দলটির সংশ্লিষ্টতায় আরও ২৯টি সংঘর্ষের ঘটনা ঘটে। এতে আহত হন ২২০ জন। এসব সংঘর্ষের অধিকাংশই বিএনপির সঙ্গে হয়েছিল।

বিএনপি ও জামায়াতের সমর্থকদের মধ্যকার সংঘর্ষও অব্যাহত রয়েছে। আসকের হিসাবে, ২০২৫ সালে দুই দলের মধ্যে ৩৩টি সংঘর্ষে তিনজন নিহত এবং ৫২০ জন আহত হন। ২০২৬ সালের জানুয়ারি থেকে সেপ্টেম্বর পর্যন্ত এ ধরনের সংঘর্ষের সংখ্যা বেড়ে দাঁড়ায় ১৩৭টিতে। এসব ঘটনায় নিহত হন ১০ জন এবং আহত হন ১ হাজার ৫৪ জন। এ ছাড়া ২০২৬ সালের প্রথম নয় মাসে ‘দুষ্কৃতকারীদের হামলা ও গুলিবর্ষণ’ শিরোনামের একটি শ্রেণিতে ৫১ জনের মৃত্যুর তথ্য রয়েছে।

সরকারের দায়িত্বে বিএনপি, জবাবদিহির প্রশ্ন

চলতি বছরের ফেব্রুয়ারিতে বিএনপি ক্ষমতায় ফেরার পর আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণের দায়িত্ব দলটির সরকারের ওপর বর্তেছে। প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, অক্টোবরে সংসদীয় দলের এক বৈঠকে তারেক রহমান চাঁদাবাজি ও জমি দখলের বিরুদ্ধে সতর্ক করেন। এ ধরনের কর্মকাণ্ডে জড়িত হলে সংসদ সদস্যদেরও জবাবদিহির আওতায় আনা হবে বলে জানান তিনি।

চট্টগ্রামের পুলিশ কমিশনার বলেছেন, রাজনৈতিক পরিচয় বিবেচনা না করেই মামলা করা হচ্ছে এবং গ্রেপ্তার করা হচ্ছে। তবে প্রথম আলোর অনুসন্ধানে এমন কিছু ঘটনার তথ্য উঠে এসেছে, যেখানে আইনি পদক্ষেপের পরিবর্তে দলীয় পদ থেকে বহিষ্কার কিংবা কমিটি বিলুপ্ত করেই ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে।

রাজনৈতিক সহিংসতার চক্র

২০০৯ সালে রাষ্ট্রবিজ্ঞানী এম. মনিরুজ্জামানের ‘পার্টি পলিটিকস অ্যান্ড পলিটিক্যাল ভায়োলেন্স ইন বাংলাদেশ: ইস্যুজ, ম্যানিফেস্টেশন অ্যান্ড কনসিকোয়েন্সেস’ শীর্ষক গবেষণায় বাংলাদেশের রাজনৈতিক সহিংসতাকে একটি চক্র হিসেবে ব্যাখ্যা করা হয়েছে। গবেষণায় বলা হয়, সংঘর্ষ রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে শত্রুতা বাড়ায় এবং সমঝোতার পথ কঠিন করে তোলে। ক্ষমতাসীন সরকার বিরোধীদের দমনে রাষ্ট্রীয় সংস্থাগুলো ব্যবহার করে, অন্যদিকে বিরোধী দলগুলো এর প্রতিক্রিয়ায় আরও আন্দোলন-সংগ্রামে জড়ায়। এভাবে সহিংসতা রাজনৈতিক সংঘাতের ফল হওয়ার পাশাপাশি সংঘাতকে দীর্ঘস্থায়ী করার কারণ হয়ে ওঠে।

গবেষণায় আরও বলা হয়েছে, বারবার সহিংসতার ঘটনা ঘটতে থাকলে নতুন প্রজন্মের রাজনৈতিক কর্মীদের কাছে দাবি আদায়ের জন্য শক্তি প্রয়োগ স্বাভাবিক পদ্ধতি হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হতে পারে। ছাত্র ও শ্রমিক সংগঠনগুলোর মাধ্যমে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, কর্মক্ষেত্র ও রাজপথে এ চর্চা ছড়িয়ে পড়তে পারে। এতে গণতান্ত্রিক রাজনীতির জন্য প্রয়োজনীয় সহনশীলতা, জবাবদিহি ও ভিন্নমতের প্রতি শ্রদ্ধার চর্চা দুর্বল হয়ে পড়ে।

প্রতিবেদনের পর্যবেক্ষণ অনুযায়ী, বাংলাদেশের বিভিন্ন সরকারের আমলে রাজনৈতিক সহিংসতার ধরন বদলালেও স্থানীয় পর্যায়ে পদ-পদবি, ব্যবসা ও সম্পদের নিয়ন্ত্রণ নিয়ে বিরোধ অব্যাহত রয়েছে। বিএনপি ক্ষমতায় ফেরার পর দলটির অভ্যন্তরীণ সংঘর্ষের ঘটনাও সামনে এসেছে। এখন আইনশৃঙ্খলা রক্ষার দায়িত্ব দলটির সরকারের। দল থেকে বহিষ্কার ও পুলিশের গ্রেপ্তারের মতো পদক্ষেপ নেওয়া হলেও রাজনৈতিক পালাবদলের মধ্যেও হত্যাকাণ্ড অব্যাহত থাকায় সহিংসতা মোকাবিলায় সরকারের প্রতিক্রিয়া কতটা বদলেছে, তা এখনো স্পষ্ট নয়।

খবরটি পড়ে আপনার প্রতিক্রিয়া

প্রতিক্রিয়া জানাতে বা খবর সংরক্ষণ করতে লগইন করুন · নতুন? অ্যাকাউন্ট খুলুন (বিনামূল্যে)

💬 মন্তব্য

✍️ মন্তব্য লিখুন… — মন্তব্য করতে বিনামূল্যে অ্যাকাউন্ট খুলুন
আগে থেকেই অ্যাকাউন্ট আছে? লগইন

এখনো কোনো মন্তব্য নেই। প্রথম মন্তব্যটি আপনিই করুন।

মন্তব্য লেখকের নিজস্ব মত, AllTimeNews-এর নয়। অশালীন, ব্যক্তিগত আক্রমণ বা বিজ্ঞাপনমূলক মন্তব্য মুছে ফেলা হবে। · গোপনীয়তা / Datenschutz