হত্যা, চাঁদাবাজি ও মাদকে উদ্বেগজনক খুলনা
সন্ত্রাসী গ্রুপ, কিশোর গ্যাং ও ছিনতাইকারীদের দৌরাত্ম্যে নিরাপত্তাহীনতায় নগরবাসী।
খুলনায় একের পর এক হত্যাকাণ্ড, চাঁদাবাজি, মাদক কারবার ও ছিনতাইয়ের ঘটনায় উদ্বেগ বাড়ছে। মহানগরীসহ জেলার বিভিন্ন এলাকায় অপরাধের শিকার হচ্ছেন সাধারণ মানুষ, ব্যবসায়ী ও বিভিন্ন পেশার ব্যক্তিরা। আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন নাগরিক সমাজের প্রতিনিধিরা। পুলিশ বলছে, অপরাধ দমনে অভিযান ও গ্রেপ্তার কার্যক্রম চলছে।
চলতি বছরে মহানগরীতে নিহত ৩৭
প্রতিবেদন অনুযায়ী, চলতি বছরে খুলনা মহানগরীসহ জেলায় গুলি ও গণপিটুনিতে ৭৫টি হত্যাকাণ্ডসহ নানা অপরাধের ঘটনা ঘটেছে। সর্বশেষ গত সোমবার দুপুরে রূপসা উপজেলার আইচগাতী ইউনিয়নের আঠারোবাঁকী নদী থেকে সোহাগ ও রেজাউল করিম নামে দুই যুবকের গুলিবিদ্ধ মরদেহ উদ্ধার করে পুলিশ। এর আগের দিন রোববার সন্ধ্যায় নগরীর রায়েরমহলে নিজ ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানে কুপিয়ে হত্যা করা হয় খুলনা মহানগর তাঁতী দলের যুগ্ম আহ্বায়ক সৈয়দ হুমায়ুন কবিরকে।
খুলনা মেট্রোপলিটন পুলিশের (কেএমপি) হিসাব অনুযায়ী, চলতি বছরের ১ নভেম্বর পর্যন্ত মহানগরীতে দুর্বৃত্তদের হাতে নারীসহ ৩৭ জন নিহত হয়েছেন। নিহতদের অধিকাংশই তরুণ।
মাসভিত্তিক হিসাবে জানুয়ারিতে একজন, ফেব্রুয়ারিতে চারজন, মার্চে চারজন, এপ্রিলে দুজন, মে ও জুনে তিনজন করে, জুলাইয়ে তিনজন, আগস্টে পাঁচজন, সেপ্টেম্বরে ছয়জন, অক্টোবরে চারজন এবং ১ নভেম্বর দুজন নিহত হন। এ সময়ে হত্যাসহ বিভিন্ন অপরাধে ১৫৯ জনকে গ্রেপ্তার করেছে পুলিশ।
২২টি সন্ত্রাসী গ্রুপ ও কিশোর গ্যাংয়ের দাপট
পুলিশের তালিকায় খুলনা মহানগরীতে ২২টি সন্ত্রাসী সংগঠন ও কিশোর গ্যাং রয়েছে। তালিকায় রয়েছে ‘বি’ কোম্পানি, আশিক বাহিনী, নূর আজিম গ্রুপ, গোল্ডেন বয়েজ, টিপসি বয়েজ, কিং অব রূপসা, পলাশ গ্রুপ, হুমা বাহিনী, ডেঞ্জার বয়েজ, টেঙ্কি শাওন গ্রুপ, আরমান ওরফে আরমিন গ্রুপ, শাকিল গ্রুপ, নাসিম গ্রুপ, সেভেন স্টার, নাইন্টিন বয়েজ, ব্লাড বয়েজ, ব্ল্যাক ঈগল, ডার্ক নাইটস, সিন্ডিকেট, চিংড়ি পলাশ গ্রুপ, শিপলু ওরফে রকি গ্রুপ এবং সিনবাদ গ্রুপ। বিভিন্ন পাড়া-মহল্লায় এসব সংগঠনের উপগ্রুপও রয়েছে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
প্রতিবেদনটির তথ্য অনুযায়ী, মাদক ব্যবসার নিয়ন্ত্রণ নিয়ে বিভিন্ন গ্রুপের মধ্যে সংঘর্ষ ও হত্যাকাণ্ডের ঘটনা ঘটছে। এসব সংগঠনের মধ্যে ‘বি’ কোম্পানির তৎপরতা বেশি বলে দাবি করা হয়েছে।
পুলিশের একটি নির্ভরযোগ্য সূত্রের বরাতে প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, মহানগরীতে তালিকাভুক্ত শীর্ষ সন্ত্রাসীর সংখ্যা ১৫। তাঁদের কেউ কেউ কারাগারে থেকেও নিজেদের বাহিনী নিয়ন্ত্রণ করছেন বলে অভিযোগ রয়েছে। ‘বি’ কোম্পানির শীর্ষ নেতা রনি চৌধুরী ওরফে বাবু চৌধুরী ওরফে গ্রেনেড বাবু ভারত বা মালয়েশিয়া থেকে বাহিনী পরিচালনা করছেন বলেও সূত্রের দাবি। মাদক বিক্রির অর্থ থেকে তাঁর দৈনিক আয় অর্ধকোটি টাকার বেশি বলে দাবি করা হয়েছে।
এক পুলিশ কর্মকর্তার ভাষ্য অনুযায়ী, কয়েক মাস আগে শামসুর রহমান রোডে গ্রেনেড বাবুর বাড়িতে অভিযান চালিয়ে তাঁর বাবা মিন্টু চৌধুরীসহ কয়েকজনকে গ্রেপ্তার করা হয়। ওই অভিযানে প্রায় ৪০ লাখ টাকা জব্দ করা হয়েছিল। কর্মকর্তাটির দাবি, জব্দ করা অর্থ মাদক বিক্রির আয় ছিল। এসব অভিযোগের বিষয়ে প্রতিবেদনে স্বাধীনভাবে যাচাই করা তথ্য উল্লেখ নেই।
চিকিৎসক ও ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানে চাঁদাবাজির অভিযোগ
খুলনায় হত্যাকাণ্ডের পাশাপাশি চাঁদাবাজির অভিযোগও বাড়ছে। নগরীর সরকারি আযম খান কমার্স কলেজের পাশে এক চিকিৎসকের কাছে ‘বি’ কোম্পানি তিন কোটি টাকা চাঁদা দাবি করেছিল বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। নিরাপত্তাহীনতায় ওই চিকিৎসক থানায় অভিযোগ না করে চেম্বার বন্ধ রেখে আত্মগোপনে যান বলে জানা গেছে। একই এলাকার আরও দুই চিকিৎসকের কাছে চাঁদা দাবির অভিযোগ রয়েছে।
গত ৭ অক্টোবর খুলনা সদর সাব-রেজিস্ট্রারের কার্যালয় থেকে সাব-রেজিস্ট্রার তন্ময় কুমার মণ্ডলকে অস্ত্রের মুখে তুলে নিয়ে চাঁদা দাবি করা হয় বলে প্রতিবেদনে বলা হয়েছে। পরে মাসে ৩৫ লাখ টাকা দেওয়ার শর্তে তিনি মুক্তি পান বলে সূত্রের দাবি। তবে তন্ময় কুমার মণ্ডল চাঁদা দাবির বিষয়টি এড়িয়ে গেছেন।
এ ছাড়া কমার্স কলেজের পাশের একটি ক্লিনিকের কাছে ১০ কোটি টাকা চাঁদা দাবি এবং নির্ধারিত সময়ে অর্থ না পেয়ে ক্লিনিকে ভাঙচুরের অভিযোগ রয়েছে। পরে অর্থের বিনিময়ে সংশ্লিষ্ট গ্রুপের সঙ্গে সমঝোতা হয় বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান, হোটেল-রেস্তোরাঁ, বেসরকারি হাসপাতাল, ক্লিনিক, ডায়াগনস্টিক সেন্টার, ফার্মেসি ও সরকারি কর্মকর্তাদের পাশাপাশি ইজিবাইকচালক, মুদি দোকানি ও ফুটপাতের ব্যবসায়ীরাও চাঁদাবাজির শিকার হচ্ছেন বলে অভিযোগ রয়েছে।
গত ২৬ অক্টোবর পাইকগাছা উপজেলা স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তা আহসানারা বিনতে আহমেদকে ফোনে চাঁদা দাবি ও প্রাণনাশের হুমকি দেওয়ার অভিযোগ ওঠে আসলাম শিকদার নামে এক ব্যক্তির বিরুদ্ধে। টাকা না দিলে তাঁকে তুলে নিয়ে যাওয়ার হুমকি দেওয়া হয় বলেও প্রতিবেদনে বলা হয়েছে। এর আগের দিন ২৫ অক্টোবর পাইকগাছা উপজেলা আইনজীবী সমিতির সভাপতি অ্যাডভোকেট জি এম আব্দুস সাত্তার ও সাধারণ সম্পাদক অ্যাডভোকেট জি এম আক্কাস আলীকে ফোনে চাঁদা চেয়ে হুমকি দেওয়ার অভিযোগ ওঠে।
গডফাদারদের শনাক্তের দাবি নাগরিক নেতাদের
খুলনার আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন নাগরিক সমাজের প্রতিনিধিরা। নাগরিক নেতা অ্যাডভোকেট বাবুল হাওলদার বলেন, নগরীর বিভিন্ন এলাকায় সন্ত্রাসী, মাদক ব্যবসায়ী ও চাঁদাবাজদের তৎপরতা বেড়েছে। ছিনতাইয়ের ভয়ে রাতে চলাচল করতেও মানুষ আতঙ্কিত হচ্ছে বলে মন্তব্য করেন তিনি।
বাংলাদেশ মানবাধিকার বাস্তবায়ন সংস্থার খুলনা বিভাগীয় সমন্বয়কারী অ্যাডভোকেট মোমিনুল ইসলাম বলেন, পুলিশের যথাযথ ভূমিকার অভাব এবং প্রকৃত সন্ত্রাসীরা ধরাছোঁয়ার বাইরে থাকায় হত্যাকাণ্ডের মতো ঘটনা ঘটছে। তাঁর মতে, অপরাধের নেপথ্যের মদতদাতাদের চিহ্নিত করা না গেলে খুলনায় শান্তি ফিরিয়ে আনা কঠিন হবে।
সুশাসনের জন্য নাগরিক—সুজনের খুলনা জেলা সভাপতি অ্যাডভোকেট কুদরত-ই খুদাও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে নগরীর পরিস্থিতি নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন। তাঁর ভাষ্য, একসময়ের শান্ত খুলনায় এখন হত্যা, ছিনতাই, জমি দখল ও চাঁদাবাজির ঘটনায় সাধারণ মানুষ আতঙ্কে রয়েছেন।
মাদককেন্দ্রিক অপরাধের কথা বলছে পুলিশ
খুলনা মেট্রোপলিটন পুলিশের (কেএমপি) ডেপুটি কমিশনার (ডিবি) মোহাম্মদ আহাদুজ্জামান মিয়া বলেন, খুলনায় মাদককেন্দ্রিক অপরাধ বেশি। অনেক ক্ষেত্রে বস্তি এলাকার কিশোর ও তরুণদের ব্যবহার করে অপরাধী সিন্ডিকেট পরিচালিত হচ্ছে। অপরাধীদের দ্রুত শনাক্ত ও গ্রেপ্তারে পুলিশ তৎপর রয়েছে বলেও জানান তিনি।
খুলনা জেলা পুলিশ সুপার সরকার ওমর ফারুক বলেন, সন্ত্রাস দমনে ব্লক রেইড, স্পট রেইড এবং তালিকা ধরে বাড়ি বাড়ি তল্লাশি চালানো হচ্ছে। তাঁর দাবি, জেলার হত্যাকাণ্ডগুলোর সঙ্গে মাদক কারবারের যোগসূত্র রয়েছে। মাদকের স্পটগুলোতে অভিযান চালানো হচ্ছে এবং দাগি আসামিরা যাতে দ্রুত জামিন না পান, সে বিষয়ে বিচার বিভাগের সঙ্গে সমন্বয়ের চেষ্টা চলছে।
দ্রুত সন্ত্রাস দমন করে খুলনাকে আবার শান্তির নগরীতে পরিণত করার আশ্বাস দিয়েছেন পুলিশ সুপার।
খবরটি পড়ে আপনার প্রতিক্রিয়া
প্রতিক্রিয়া জানাতে বা খবর সংরক্ষণ করতে লগইন করুন · নতুন? অ্যাকাউন্ট খুলুন (বিনামূল্যে)
বিক্ষোভ ঘিরে সতর্ক আইনশৃঙ্খলা বাহিনী, মাঠে বিএনপি
১৬ ঘণ্টা আগে💬 মন্তব্য
✍️ মন্তব্য লিখুন… — মন্তব্য করতে বিনামূল্যে অ্যাকাউন্ট খুলুনএখনো কোনো মন্তব্য নেই। প্রথম মন্তব্যটি আপনিই করুন।
মন্তব্য লেখকের নিজস্ব মত, AllTimeNews-এর নয়। অশালীন, ব্যক্তিগত আক্রমণ বা বিজ্ঞাপনমূলক মন্তব্য মুছে ফেলা হবে। · গোপনীয়তা / Datenschutz





