মূল অংশে যান
সোমবার, ২ নভেম্বর ২০২৬ · ১৭ কার্তিক ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ · ২২ জমাদিউল আউয়াল ১৪৪৮ হিজরি
ব্রেকিং
নারী

যৌন পেশায় আসার আগে ৯৩% নারী সহিংসতার শিকার

৩০ নারীর জীবনকাহিনি বিশ্লেষণে উঠে এসেছে শৈশবের নির্যাতন, দারিদ্র্য, পারিবারিক ভাঙন ও ঘরছাড়া হওয়ার অভিজ্ঞতা; গবেষকদের মতে, প্রতিরোধে প্রয়োজন শক্তিশালী শিশু সুরক্ষা ব্যবস্থা।

অলটাইম নিউজ ডেস্ক প্রকাশ: ২ নভেম্বর ২০২৬, ২:৫২ অপরাহ্ণ · আপডেট: ২ নভেম্বর ২০২৬, ৩:৫৫ অপরাহ্ণ · ৪ মিনিটে পড়ুন
যৌন পেশায় আসার আগে ৯৩% নারী সহিংসতার শিকার
প্রতীকী ছবি

ঢাবি প্রতিনিধি

বাংলাদেশের পথভিত্তিক নারী যৌনকর্মীদের জীবনে শৈশবের নির্যাতন, চরম দারিদ্র্য, পারিবারিক অস্থিতিশীলতা ও সহিংসতার গভীর প্রভাব রয়েছে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের এক গবেষণায় দেখা গেছে, এতে অংশ নেওয়া নারীদের ৯৩ শতাংশ যৌন পেশায় যুক্ত হওয়ার আগেই গুরুতর যৌন বা শারীরিক সহিংসতার শিকার হয়েছেন।

আন্তর্জাতিক জার্নাল কালচার অ্যান্ড সাইকোলজি-তে প্রকাশিত ‘বিয়ন্ড রিডেম্পশন: প্রিভেনশন, প্রটেকশন অ্যান্ড ন্যারেটিভ আইডেন্টিটি কনস্ট্রাকশন অ্যামং বাংলাদেশি স্ট্রিট-বেজড ফিমেল সেক্স ওয়ার্কার্স’ শীর্ষক গবেষণায় এসব তথ্য উঠে এসেছে।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের মাইন্ডওয়েল রিসার্চ ল্যাবের অধীনে গবেষণাটি পরিচালিত হয়। বিশ্ববিদ্যালয়ের এডুকেশনাল অ্যান্ড কাউন্সেলিং সাইকোলজি বিভাগের চেয়ারম্যান সহযোগী অধ্যাপক ড. মো. আজহারুল ইসলামের নেতৃত্বে চার সদস্যের একটি গবেষক দল এতে কাজ করে।

৩০ নারীর অভিজ্ঞতায় উঠে এসেছে ছয়টি বিষয়

গবেষণায় বাংলাদেশের বিভিন্ন শহরাঞ্চলের ১৮ থেকে ৪৫ বছর বয়সী ৩০ জন পথভিত্তিক নারী যৌনকর্মীর জীবনকাহিনি ও মনস্তাত্ত্বিক অবস্থা বিশ্লেষণ করা হয়। তাঁদের ১০৩টি গুরুত্বপূর্ণ স্মৃতি ও অভিজ্ঞতা পর্যালোচনা করে গবেষকেরা ছয়টি প্রধান বিষয় চিহ্নিত করেন। সেগুলো হলো—ট্রমা ও নিপীড়ন, মাতৃত্ব, টিকে থাকার সংগ্রাম, সামাজিক সহায়তা, ক্ষমতায়ন এবং সামাজিক লজ্জা ও কলঙ্ক।

গবেষণায় অংশ নেওয়া সব নারীই শৈশবে চরম দারিদ্র্য ও পারিবারিক অস্থিতিশীলতার অভিজ্ঞতার কথা জানিয়েছেন। তাঁদের ৬৭ শতাংশকে অল্প বয়সে বাধ্য হয়ে বাড়ি ছাড়তে হয়েছিল। আর ৯৩ শতাংশ যৌন পেশায় যুক্ত হওয়ার আগেই গুরুতর যৌন বা শারীরিক সহিংসতার শিকার হন।

একজন অংশগ্রহণকারী গবেষকদের জানান, মাত্র ১০ বছর বয়সে তিনি তিনজন প্রাপ্তবয়স্ক ব্যক্তির নির্যাতনের শিকার হন। এতে তাঁর প্রচুর রক্তক্ষরণ হলেও কেউ সাহায্য করেনি। আরেক নারী কাজের সন্ধানে ঢাকায় এসে প্রতারণার শিকার হন এবং তাঁকে জোরপূর্বক যৌন পেশায় ঠেলে দেওয়া হয় বলে জানান।

গবেষকদের মতে, এসব অভিজ্ঞতা নারীদের জীবনের গতিপথ নির্ধারণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে। তাঁদের বিশ্লেষণে, অংশগ্রহণকারীদের ক্ষেত্রে যৌন পেশায় যুক্ত হওয়াকে নিছক ব্যক্তিগত পছন্দ হিসেবে ব্যাখ্যা করা যায় না; বরং দীর্ঘদিনের নিপীড়ন ও বেঁচে থাকার সংগ্রাম এর সঙ্গে জড়িত।

ট্রমায় অস্পষ্ট হয়ে পড়ে স্মৃতি

গবেষণায় অংশ নেওয়া নারীদের জীবনের গুরুত্বপূর্ণ বাঁকবদলের ঘটনাগুলো মনে করার ক্ষেত্রেও অস্পষ্টতা দেখা গেছে। গবেষকদের বিশ্লেষণ অনুযায়ী, এসব বাঁকবদলসংক্রান্ত স্মৃতির ৮৫ শতাংশ ছিল অতিসাধারণীকৃত—অর্থাৎ নির্দিষ্ট ঘটনা ও বিস্তারিত বিবরণের বদলে স্মৃতিগুলো ছিল অস্পষ্ট, বিস্তৃত বা বিচ্ছিন্ন।

গবেষকেরা বিষয়টিকে গুরুতর ট্রমার সম্ভাব্য প্রভাবের সঙ্গে সম্পর্কিত করেছেন। তাঁদের ব্যাখ্যায়, আঘাতমূলক অভিজ্ঞতা মানুষের স্মৃতি সংগঠিত করার প্রক্রিয়াকে প্রভাবিত করতে পারে। ফলে অতীতের ঘটনাগুলো একটি ধারাবাহিক জীবনকাহিনি হিসেবে মনে রাখা কঠিন হয়ে উঠতে পারে।

মাতৃত্ব ও সহকর্মীদের সংহতি মানসিক শক্তি জোগায়

গবেষণায় উঠে এসেছে, এসব নারীর টিকে থাকার সংগ্রাম শুধু ব্যক্তিগত প্রচেষ্টার ওপর নির্ভরশীল নয়। মাতৃত্ব, সহকর্মীদের পারস্পরিক সহযোগিতা এবং এনজিওর সহায়তা তাঁদের মানসিকভাবে টিকে থাকতে ভূমিকা রেখেছে।

অংশগ্রহণকারীদের মধ্যে ২৭ জন ছিলেন মা। গবেষকদের পর্যবেক্ষণে, তাঁদের প্রায় সবাই সন্তানকে ঘিরে বেঁচে থাকার নতুন প্রেরণা খুঁজে পেয়েছেন। সন্তানের ভবিষ্যৎ সুরক্ষার আকাঙ্ক্ষা তাঁদের মানসিকভাবে ভেঙে পড়া থেকে রক্ষা করতে সহায়তা করেছে। তবে কন্যাসন্তানের নিরাপত্তা নিয়ে তাঁদের মধ্যে গভীর উদ্বেগও রয়েছে।

এ ছাড়া সহকর্মীদের সহমর্মিতা ও পারস্পরিক সহযোগিতাকে গুরুত্বপূর্ণ মানসিক শক্তি হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে। প্রায় ৭০ শতাংশ অংশগ্রহণকারী জানিয়েছেন, এনজিও পরিচালিত কাউন্সেলিং, প্রশিক্ষণ ও সহায়তা কর্মসূচি তাঁদের জীবন নতুনভাবে গড়ে তোলার সুযোগ দিয়েছে।

গবেষকদের মতে, মাতৃত্ব, সহকর্মীদের সংহতি ও প্রাতিষ্ঠানিক সহায়তা একত্রে তাঁদের পরিচয় পুনর্গঠনে ভূমিকা রাখে। তাঁরা এ প্রক্রিয়াকে ‘সমষ্টিগত মনস্তাত্ত্বিক সুরক্ষাকবচ’ হিসেবে বর্ণনা করেছেন।

সামাজিক কলঙ্ক ও আত্মগ্লানির চাপ

সহায়তা পাওয়ার পরও সামাজিক কলঙ্ক এসব নারীর জীবনে বড় বাধা হয়ে রয়েছে। সমাজের নেতিবাচক দৃষ্টিভঙ্গির কারণে তাঁরা নিজেদের পরিচয় ও পেশা নিয়ে মানসিক দ্বন্দ্বে ভোগেন।

গবেষণায় উঠে এসেছে, পরিচয় প্রকাশ পেলে অপমানের শিকার হওয়া, বাসা ভাড়া পেতে সমস্যায় পড়া এবং সন্তানের শিক্ষাজীবনে বাধার আশঙ্কা তাঁদের দৈনন্দিন জীবনে অনিশ্চয়তা তৈরি করে। ফলে আর্থিক ও মানসিক সংকটের পাশাপাশি সামাজিক বিচ্ছিন্নতাও তাঁদের জন্য বড় চ্যালেঞ্জ।

প্রতিরোধে চারটি পদক্ষেপের সুপারিশ

গবেষণায় যৌন পেশায় প্রবেশের পেছনে শৈশবের নির্যাতন, দারিদ্র্য ও পারিবারিক অস্থিতিশীলতার ভূমিকা বিবেচনায় নিয়ে চারটি পদক্ষেপের সুপারিশ করা হয়েছে।

১. ঝুঁকিতে থাকা মেয়েশিশুদের জন্য শক্তিশালী শিশু সুরক্ষা ব্যবস্থা গড়ে তোলা।

২. গৃহহীন কিশোরীদের শোষণের শিকার হওয়ার আগেই নিরাপদ আশ্রয় ও অর্থনৈতিক সহায়তা নিশ্চিত করা।

৩. অতিদারিদ্র্যপীড়িত এলাকার ঝুঁকিপূর্ণ পরিবারগুলোর জন্য অগ্রাধিকারভিত্তিতে সামাজিক সুরক্ষা কর্মসূচি চালু করা।

৪. পথে বসবাসকারী শিশুদের জন্য ট্রমা-সচেতন সেবা ও মানসিক স্বাস্থ্য সহায়তা নিশ্চিত করা।

‘সমস্যাটি ব্যক্তির চরিত্রের নয়, কাঠামোর’

গবেষক দলের প্রধান ড. মো. আজহারুল ইসলাম বলেন, গবেষণায় অংশ নেওয়া ৩০ জনের মধ্যে একজনও স্বেচ্ছায় এই পেশায় আসেননি। তাঁর ভাষ্য অনুযায়ী, শৈশবের দারিদ্র্য, পারিবারিক ভাঙন, ঘরছাড়া হওয়া ও সহিংসতার অভিজ্ঞতা তাঁদের জীবনে একটি সাধারণ ধারা তৈরি করেছে।

তিনি বলেন, “সমস্যাটি ব্যক্তির ‘চরিত্রের’ নয়, কাঠামোর।”

ড. আজহারুল ইসলামের মতে, সমস্যা তৈরি হওয়ার পর ব্যবস্থা নেওয়ার পরিবর্তে শুরুতেই প্রতিরোধমূলক উদ্যোগ নেওয়া জরুরি। শিশু সুরক্ষা, নিরাপদ আশ্রয়, অর্থনৈতিক সহায়তা এবং মানসিক স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিত করা গেলে ঝুঁকিতে থাকা মেয়েশিশু ও কিশোরীদের শোষণের মুখে পড়া ঠেকাতে সহায়তা করা সম্ভব।