দুই সন্তান আর চাকরির দায়িত্ব সামলে ৪৫তম বিসিএসে প্রশাসন ক্যাডারে সুমনা পারভীন
ঘুমন্ত শিশুর পাশে জেগে থাকা আলো
রোববার (১ নভেম্বর) যোগ দিয়েছেন ৪৫তম বিসিএসের প্রশাসন ক্যাডারের কর্মকর্তা মোছাঃ সুমনা পারভীন। সহকারী কমিশনার ও নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট হিসেবে নতুন পথচলা শুরু করা এই কর্মকর্তা দুই সন্তানের মা। চাকরি, সংসার আর সন্তানদের পাশে থেকেই তিনি পৌঁছেছেন স্বপ্নের গন্তব্যে।
রাত গভীর হলে এ দেশের অনেক ঘরেই একটি আলো জেগে থাকে। শিশুর ঘুম ভেঙে যাওয়ার ভয়ে সে আলো মৃদু, কিন্তু তার নিচে খোলা থাকে একটি বই। সেই বইয়ের পাতায় মা শুধু প্রশ্নের উত্তর খোঁজেন না, খুঁজে ফেরেন নিজের স্বপ্নের ঠিকানাও। মোছাঃ সুমনা পারভীনের গল্প এমনই এক আলোর গল্প, যা কখনো নেভেনি।
ক্যাডার হওয়ার স্বপ্ন অবশ্য ছোটবেলা থেকে তাঁর সঙ্গী ছিল না। সুমনা নিজেই বলেন, "না, ছোটবেলা থেকে নয়।" স্বপ্নটা এসেছিল একটু একটু করে। পাবনা মহিলা কলেজে পড়ার সময় ডিসি অফিসের সামনে দিয়ে যাওয়া-আসার পথে খুব ইচ্ছা হতো, এমন একটি অফিসে চাকরি করবেন। এরপর একদিন মামা মেয়েদের বিসিএসে আসার বিষয়ে উৎসাহ দিলেন। ২০০৯ সালের দিকে সেই প্রথম বিসিএস নামটি তাঁর জীবনে এল। বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তির সাত মাস পর বিয়ে হলো। ক্যারিয়ার নিয়ে প্রথম আলোচনাতেই স্বামী বিসিএস নিয়ে বিস্তারিত কথা বলে তাঁকে উৎসাহী করে তুললেন। ঢাকা থেকে কুষ্টিয়ায় যাওয়ার প্রতিবার তিনি কিনে দিতেন বিসিএস-সংক্রান্ত বই। "আমি অল্প অল্প পড়তাম, ভালোই লাগত," বলেন সুমনা। তারপর লক্ষ্য ঠিক হয়ে গেল: বিসিএস। "ব্যস, আর অন্য কিছু ভাবিনি।"
সময়টা ২০১৯। পাবনা বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয় থেকে অনার্স শেষ করে সুমনা প্রস্তুতির জন্য কোচিংয়ে ভর্তি হলেন। ঠিক তখনই জীবন আরেকটি উপহার নিয়ে এল। তিনি মা হতে চলেছেন। মাতৃত্ব আর স্বপ্ন, দুটি নদীকে একসঙ্গে বয়ে নেওয়া যায় না বলেই আমরা ধরে নিই। সুমনা সে হিসাব মানলেন না। দুটিকেই বুকে ঠাঁই দিলেন। এই পথে পাশে ছিলেন স্বামী ও পরিবারের সবাই।
প্রথম বড় পরীক্ষা ছিল ৪০তম বিসিএস। তখন করোনাকাল, ছোট্ট মেয়ে বুশরাকে নিয়ে প্রস্তুতি। "সব মিলিয়ে ওই সময়টা পার করা কঠিন মনে হয়েছে," বলেন সুমনা। ৪০তম বিসিএসে তিনি নন-ক্যাডার পদে সুপারিশ পেলেন। ২০২৪ সালে যোগদানের সময় এলে তিনি আবারও মা হওয়ার অপেক্ষায়। দ্বিতীয় সন্তানের জন্মের পর বস্ত্র অধিদপ্তরে সহকারী পরিচালক হিসেবে কাজ শুরু করলেন। কিন্তু ক্যাডারের স্বপ্ন তাঁকে ডাকছিলই। এর মধ্যে আরও কয়েকটি বিসিএসে অংশ নিলেন, আর প্রতিটি অভিজ্ঞতা তাঁর কাছে হয়ে উঠল পরের ধাপে ওঠার সিঁড়ি।
৪৫তম বিসিএসের প্রিলিমিনারিতে আবেদন করেছিলেন প্রায় ৩ লাখ ৪৬ হাজার প্রার্থী, পরীক্ষা দেন ২ লাখ ৬৮ হাজারের বেশি। প্রতিযোগিতার এই বিশাল সমুদ্রে সুমনার একটি বড় সুবিধা ছিল, চাকরিতে যোগ দেওয়ার আগেই লিখিত পরীক্ষা শেষ করে ফেলা। "ফলে প্রস্তুতিতে সময় দিতে পেরেছি। আর ছিল দুই পরিবারের সাপোর্ট," বলেন তিনি। তখন বেশির ভাগ সময় তিনি থাকতেন রবীন্দ্রনাথের স্মৃতিধন্য শিলাইদহে বাবার বাড়িতে, আর বইয়ে ডুবে থাকতেন। মেয়েকে দেখে রাখতেন মা ও পরিবারের অন্যরা।
চাকরিতে যোগ দেওয়ার পর সময়ের হিসাব হয়ে উঠল আরও সূক্ষ্ম। "সারাদিন অফিসে ব্যস্ততা শেষে বাসায় ফিরে সংসার, বাচ্চা সামলানো, বুশরাকে পড়ানো, সব মিলিয়ে নিজের পড়াশোনার সময় বের করা কঠিন ছিল," বলেন সুমনা। তাই ভাইভার আগে তিনি প্রতি শুক্র ও শনিবার সন্তানদের মায়ের কাছে রেখে বাইরে গিয়ে পাঁচ-ছয় ঘণ্টা করে পড়তেন। ভাইভা বোর্ডের মুখোমুখি হতে বস্ত্র অধিদপ্তরের চাকরির অভিজ্ঞতা তাঁকে অনেক সাহায্য করেছে।
শেষ পর্যন্ত স্বপ্ন ধরা দিল। ৪৫তম বিসিএসের গেজেটে ১ হাজার ৭০২ জনের নিয়োগের মধ্যে প্রশাসন ক্যাডারে ২৬৬ জন, আর সেই তালিকায় ছিল সুমনা পারভীনের নাম। ১ নভেম্বর, যোগদানের নির্ধারিত দিনে তিনি যোগ দিলেন।
বাঙালি নারী যখন কিছু পেতে নিবিড় চেষ্টা চালিয়ে যান, সে চেষ্টার পেছনের গল্প আমাদের প্রায়ই অজানা থেকে যায়। অথচ সে গল্প কোনো দুঃসাহসিক অভিযানের চেয়ে কম নয়। সব দায়িত্ব সামলে স্বপ্নকে বাস্তব করা মুখে বলা যত সহজ, করা তার চেয়ে অনেক বেশি কঠিন।
নিজের স্বপ্ন ছুঁয়ে ফেলার পরও তাঁর যাত্রা থামেনি। যে মমতা আর দৃঢ়তায় তিনি এতদিন পরিবারকে আগলে রেখেছেন, সেই একই দৃঢ়তায় দেশের নীতি-নৈতিকতার জায়গায় কোনো ছাড় না দেওয়ার প্রত্যয় তাঁর। নীতি, নৈতিকতা ও দেশপ্রেমের সমন্বয়ে দেশ গড়ার স্বপ্ন দেখেন তিনি, আর এই পথে সবার দোয়া চান।
এই যাত্রাকে এক বাক্যে বর্ণনা করতে বললে সুমনা মনে করেন পাওলো কোয়েলহোর দ্য আলকেমিস্ট-এর সান্তিয়াগোর কথা। "শুধু গল্প শুনেই লক্ষ্য স্থির করা আর অর্জন না হওয়া পর্যন্ত চেষ্টা না ছাড়া।" ডিসি অফিসের সামনে দিয়ে হেঁটে যাওয়া সেই কলেজ-ছাত্রীর কাছে একদিন একটি গল্প পৌঁছেছিল। সেই গল্পের পিছু ছাড়েননি তিনি।
যে আলোটা এতদিন ঘুমন্ত শিশুর পাশে মৃদু জ্বলত, এবার তা ছড়িয়ে পড়বে আরও অনেকের জীবনে।
খবরটি পড়ে আপনার প্রতিক্রিয়া
প্রতিক্রিয়া জানাতে বা খবর সংরক্ষণ করতে লগইন করুন · নতুন? অ্যাকাউন্ট খুলুন (বিনামূল্যে)
💬 মন্তব্য
✍️ মন্তব্য লিখুন… — মন্তব্য করতে বিনামূল্যে অ্যাকাউন্ট খুলুনএখনো কোনো মন্তব্য নেই। প্রথম মন্তব্যটি আপনিই করুন।
মন্তব্য লেখকের নিজস্ব মত, AllTimeNews-এর নয়। অশালীন, ব্যক্তিগত আক্রমণ বা বিজ্ঞাপনমূলক মন্তব্য মুছে ফেলা হবে। · গোপনীয়তা / Datenschutz





