মূল অংশে যান
সোমবার, ২ নভেম্বর ২০২৬ · ১৭ কার্তিক ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ · ২২ জমাদিউল আউয়াল ১৪৪৮ হিজরি
ব্রেকিং
আন্তর্জাতিক

ইরানে বিক্ষোভ: পাল্টাপাল্টি হামলার হুমকি ওয়াশিংটন ও তেহরানের

অলটাইম নিউজ ডেস্ক প্রকাশ: ১১ জানুয়ারি ২০২৬, ১০:১৮ অপরাহ্ণ · ৪ মিনিটে পড়ুন
ইরানে বিক্ষোভ: পাল্টাপাল্টি হামলার হুমকি ওয়াশিংটন ও তেহরানের

ইরানে চলমান সরকারবিরোধী বিক্ষোভ দমনে কঠোর অবস্থান নিয়েছে প্রশাসন। এই বিক্ষোভ ঘিরে দেশটির সরকারের সঙ্গে আবারও মুখোমুখি অবস্থান নিয়েছে যুক্তরাষ্ট্র।

রবিবার তেহরান হুঁশিয়ারি দিয়েছে, যদি যুক্তরাষ্ট্র ইরানের ওপর কোনো সামরিক হামলা চালায়, তবে তারা ইসরায়েল এবং ওই অঞ্চলে থাকা মার্কিন সামরিক ঘাঁটিগুলোতে পাল্টা শক্তিশালী হামলা চালাবে।

চলমান বিক্ষোভ দমনে ইরান সহিংস হলে সামরিক হামলার মাধ্যমে সেটির জবাব দেওয়া হবে বলে যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প একাধিকবার হুঁশিয়ার করেছেন বলে বিবিসির প্রতিবেদনে বলা হয়েছে। সেখানে বলা হয়, এরই মধ্যে অর্ধশতাধিক বিক্ষোভকারী নিহত হয়েছে। গ্রেপ্তার করা হয়েছে ২,৫০০ জনেরও বেশি মানুষকে।

এমন পরিস্থিতিতে ইরানে মার্কিন হস্তক্ষেপের সম্ভাবনা নিয়ে আলোচনা করেছে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল।  

গত শনিবার ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু ও মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিওর মধ্যে ফোনে বিষয়টি নিয়ে কথা হয়েছে বলে এক খবরে জানিয়েছে বার্তা সংস্থা রয়টার্স। প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ইরানে যুক্তরাষ্ট্রের সম্ভাব্য যেকোনো হস্তক্ষেপের বিষয়ে ইসরায়েল সর্বোচ্চ সতর্ক অবস্থায় রয়েছে।

ভুল না করার হুঁশিয়ারি তেহরানের

ইরানের পার্লামেন্ট স্পিকার মোহাম্মদ বাঘের কালিবাফ রবিবার সংসদ অধিবেশনে যুক্তরাষ্ট্রকে সতর্ক করে বলেন, তারা যেন কোনো ধরনের “ভুল হিসাব-নিকাশ” না করে। রেভল্যুশনারি গার্ডসের সাবেক এই কমান্ডার হুঁশিয়ার করে বলেন, “যদি ইরানে কোনো হামলা হয়, তবে দখলকৃত অঞ্চল (ইসরায়েল) এবং যুক্তরাষ্ট্রের সব সামরিক ঘাঁটি ও জাহাজ আমাদের বৈধ লক্ষ্যবস্তু হবে।”

বিক্ষোভকারীদের ওপর বলপ্রয়োগ না করতে যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের ক্রমাগত হুমকির জবাবেই এই কড়া বার্তা দিল ইরান।

অন্যদিকে ট্রাম্প সোশাল মিডিয়ায় জানিয়েছেন, ইরান এখন স্বাধীনতার মুখ দেখছে এবং যুক্তরাষ্ট্র তাদের “সাহায্য করতে প্রস্তুত”।

নিহতের সংখ্যা নিয়ে উদ্বেগ

ইরানে গত ২৮ ডিসেম্বর থেকে শুরু হওয়া এই বিক্ষোভে নিহতের সংখ্যা হু হু করে বাড়ছে। ইউএসভিত্তিক মানবাধিকার সংস্থা এইচআরএএনএ’র মতে, নিহতের সংখ্যা ১১৬ জন; তবে সেখানে নিরাপত্তা বাহিনীর ৩৭ জন সদস্যও রয়েছেন। অন্যদিকে নরওয়েভিত্তিক সংস্থাগুলো বলছে, অন্তত ৫১ জন বিক্ষোভকারী মারা গেছেন, যার মধ্যে ৯ জন শিশু রয়েছে।

তবে ইরান সরকারের পক্ষ থেকে নিরাপত্তা বাহিনীর ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতির দাবি করা হয়েছে। সরকারি সংবাদ সংস্থা তাসনিম নিউজ জানিয়েছে, সারা দেশে বিক্ষোভে এ পর্যন্ত ১০৯ জন নিরাপত্তা সদস্য নিহত হয়েছেন। ইসফাহান ও কেরমানশাহ শহরে নিহত পুলিশ ও নিরাপত্তা রক্ষীদের জানাজা রাষ্ট্রীয় টেলিভিশনে সরাসরি সম্প্রচার করা হয়।

ইন্টারনেট ব্ল্যাকআউট ও বর্তমান পরিস্থিতি

বিক্ষোভের খবর ছড়ানো আটকাতে গত বৃহস্পতিবার থেকে ইরানে ইন্টারনেট সংযোগ প্রায় পুরোপুরি বিচ্ছিন্ন করে দেওয়া হয়েছে। নেটব্লকস-এর তথ্যমতে, বর্তমানে সংযোগ স্বাভাবিকের চেয়ে মাত্র ১ শতাংশ রয়েছে।

বিক্ষোভের সূত্রপাত হয়েছিল আকাশচুম্বী মুদ্রাস্ফীতি ও দ্রব্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতির প্রতিবাদে, যা পরে ১৯৭৯ সাল থেকে চলে আসা ইসলামি শাসনব্যবস্থার বিরুদ্ধে গণআন্দোলনে রূপ নেয়। তেহরানের পুনাকসহ বিভিন্ন এলাকায় সাধারণ মানুষকে থালা-বাসন বা ধাতব বস্তু পিটিয়ে অভিনব কায়দায় প্রতিবাদ জানাতে দেখা গেছে।

ইসরায়েল ও যুক্তরাষ্ট্রের অবস্থান

ইসরায়েলি প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু ও মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিও ইরানের পরিস্থিতি নিয়ে জরুরি আলোচনা করেছেন। নেতানিয়াহু এক সাক্ষাৎকারে জানিয়েছেন, ইরান যদি ইসরায়েলকে আক্রমণ করে তবে তার ফল হবে ভয়াবহ।

রয়টার্সের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, মার্কিন গোয়েন্দা কর্মকর্তারা এই পরিস্থিতিকে একটি “ধৈর্যের খেলা” হিসেবে বর্ণনা করেছেন। তাদের মতে, একদিকে বিক্ষোভকারীরা সরকারের ওপর চাপ বজায় রেখে কর্মকর্তাদের পক্ষত্যাগের অপেক্ষা করছে, অন্যদিকে প্রশাসন ভয় দেখিয়ে রাস্তা খালি করার চেষ্টা করছে যাতে যুক্তরাষ্ট্র সরাসরি হস্তক্ষেপের সুযোগ না পায়।

ইরানের পুলিশ প্রধান আহমদ-রেজা রাদান বলেছেন, “দাঙ্গাবাজদের” দমনে নিরাপত্তা বাহিনী এখন আগের চেয়ে অনেক বেশি সক্রিয়। দেশটির অ্যাটর্নি জেনারেল হুঁশিয়ারি দিয়েছেন, অস্থিরতা সৃষ্টিকারীদের মৃত্যুদণ্ডের মুখোমুখি হতে হতে পারে।

ইরানেও যেসব নিষেধাজ্ঞা

যুক্তরাষ্ট্র ইরানের ওপর বহুমুখী কঠোর নিষেধাজ্ঞা আরোপ করেছে। এর মধ্যে প্রধান হলো তেল ও জ্বালানি খাতের ওপর নিষেধাজ্ঞা, যার মাধ্যমে ইরানের প্রধান আয় বন্ধের চেষ্টা করা হয়। এছাড়া ব্যাংকিং ও আর্থিক খাতের ওপর বিধিনিষেধ থাকায় ইরান আন্তর্জাতিক বাণিজ্যে সমস্যার সম্মুখীন হচ্ছে।

২০২৫-২৬ সালের সর্বশেষ তথ্যানুযায়ী, ইরানের ড্রোন ও ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র কর্মসূচির সঙ্গে জড়িত ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানের ওপর নতুন নিষেধাজ্ঞা দেওয়া হয়েছে। ট্রাম্প প্রশাসনের ‘সর্বোচ্চ চাপ’ নীতির আওতায় জাহাজ চলাচল, ধাতু শিল্প ও সামরিক সরঞ্জাম গবেষণার ওপরও কড়াকড়ি রয়েছে। মানবাধিকার লঙ্ঘন ও বিক্ষোভ দমনে বলপ্রয়োগের অভিযোগে অনেক উচ্চপদস্থ কর্মকর্তার ওপরও ভ্রমণ ও সম্পদ বাজেয়াপ্তের নিষেধাজ্ঞা জারি করেছে যুক্তরাষ্ট্র।

নিষেধাজ্ঞার কী প্রভাব ইরানের অর্থনীতিতে

মার্কিন নিষেধাজ্ঞার ফলে ইরানের অর্থনীতি বিপর্যস্ত হয়ে পড়েছে। মুদ্রার মান কমে যাওয়ায় আকাশচুম্বী মুদ্রাস্ফীতি দেখা দিয়েছে, ফলে সাধারণ মানুষের জন্য খাবার ও ওষুধ কেনা কঠিন হয়ে পড়েছে। দেশটির প্রধান আয়ের উৎস তেল রপ্তানিতে ধস নামায় বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভে তীব্র সংকট তৈরি হয়েছে। এছাড়া আন্তর্জাতিক ব্যাংকিং ব্যবস্থা—সুইফট থেকে বিচ্ছিন্ন হওয়ায় ব্যবসা-বাণিজ্য স্থবির হয়ে পড়েছে এবং আমদানি-রপ্তানি ব্যয় বহুগুণ বেড়েছে। কাঁচামাল ও প্রযুক্তির অভাবে শিল্পকারখানা বন্ধ হওয়ায় তরুণদের মধ্যে বেকারত্ব বাড়ছে। এই সংকট কাটাতে ইরান বিকল্প পথে বাণিজ্যের চেষ্টা করলেও তা অর্থনীতির মূল ঘাটতি পূরণে যথেষ্ট হচ্ছে না।