মূল অংশে যান
মঙ্গলবার, ৩ নভেম্বর ২০২৬ · ১৮ কার্তিক ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ · ২৩ জমাদিউল আউয়াল ১৪৪৮ হিজরি
ব্রেকিং
জাতীয়

বান্ধবীর সঙ্গে ঝগড়ার পর টঙ্গীর মাঠে তাহসিফ, মৃত্যু নিয়ে ধোঁয়াশা

সিসিটিভি ফুটেজ ও রিমান্ডে পাওয়া তথ্য যাচাই করছে পুলিশ।

অলটাইম নিউজ ডেস্ক প্রকাশ: ৩ নভেম্বর ২০২৬, ৭:৪৮ পূর্বাহ্ণ · আপডেট: ৩ নভেম্বর ২০২৬, ৮:৫৪ পূর্বাহ্ণ · ৪ মিনিটে পড়ুন
বান্ধবীর সঙ্গে ঝগড়ার পর টঙ্গীর মাঠে তাহসিফ, মৃত্যু নিয়ে ধোঁয়াশা
ছবি: সংগৃহীত

বিমানবাহিনীর চাকরিচ্যুত ফ্লাইট লেফটেন্যান্ট কে এম তাহসিফ সাউরির মৃত্যুর ঘটনায় রিমান্ডে থাকা তার বন্ধু আহমেদ শাহরিয়ার রেজা দীপের দেওয়া তথ্য যাচাই করছে টঙ্গী নৌ-পুলিশ। দীপের ভাষ্য অনুযায়ী, বান্ধবীর সঙ্গে বিরোধের পর হেরোইন সেবনের উদ্দেশ্যে টঙ্গীর মাজার বস্তিসংলগ্ন মাঠে যান তাহসিফ। সেখানে পুলিশের উপস্থিতি টের পেয়ে দৌড়ে পালানোর সময় তিনি নদীতে পড়ে গিয়ে থাকতে পারেন বলে ধারণা করছে পুলিশ। তবে তাহসিফকে নদীতে পড়ে যেতে দেখেননি বলে জানিয়েছেন দীপ।

সিসিটিভি ফুটেজে দেখা গেছে, রাত ১টা ২০ মিনিটের দিকে দীপ মাঠ থেকে একা বের হয়ে আসেন। এর প্রায় ১৫ মিনিট পর রাত ১টা ৩৫ মিনিটে তাহসিফ তার মাকে ভয়েস মেসেজ পাঠিয়ে বলেন, ‘রওনা হয়েছি।’ ফলে কীভাবে তার মৃত্যু হয়েছে, তা নিয়ে এখনো ধোঁয়াশা রয়েছে।

বান্ধবীর সঙ্গে বিরোধের তথ্য যাচাই

তদন্তসংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, দীপের কাছ থেকে পাওয়া তথ্যের ভিত্তিতে রিমান্ডে থাকা তাহসিফের বান্ধবীকেও জিজ্ঞাসাবাদ করা হচ্ছে। তাহসিফের সঙ্গে তার পরিচয়, সম্পর্কের ধরন, ঘটনার দিন উত্তরা এলাকার নেস্ট বারে কী ঘটেছিল এবং তাদের মধ্যে কী কথোপকথন হয়েছিল—এসব বিষয় খতিয়ে দেখছেন তদন্তকারীরা। দীপ ও ওই নারীর বক্তব্য মিলিয়ে দেখা হচ্ছে।

তদন্তসংশ্লিষ্ট এক পুলিশ কর্মকর্তার ভাষ্য অনুযায়ী, দীপ জানিয়েছেন, ওই নারী কিছুদিন আগে অন্য এক যুবকের বাসায় ইয়াবা সেবন করতে গিয়েছিলেন। সেখানে ওই যুবকের সঙ্গে তার শারীরিক ঘনিষ্ঠতা হয় বলে দীপ দাবি করেছেন। বিষয়টি জানার পর ২৭ অক্টোবর তাহসিফ তাকে ফোন করে দেখা করতে বলেন। পরে তাকে নিয়ে উত্তরার সোনারগাঁ জনপথ সড়কের নেস্ট বারে যান।

দীপের বক্তব্য অনুযায়ী, বারে গিয়ে তাহসিফ কর্তৃপক্ষকে দুঃখের গান বাজাতে বলেন। এরপর তাদের মদ পরিবেশন করা হয়। প্রায় দেড় ঘণ্টা তারা মদ পান করেন। এ সময় দীপও তাদের সঙ্গে ছিলেন। মদ্যপানের একপর্যায়ে অন্য এক যুবকের সঙ্গে ওই নারীর ইয়াবা সেবন ও রাত কাটানোর বিষয় নিয়ে প্রশ্ন করেন তাহসিফ। এ নিয়ে তাদের মধ্যে বিরোধ তৈরি হয়।

একপর্যায়ে তাহসিফ হেরোইন সেবনের কথা বলেন বলে দীপ দাবি করেছেন। পরে তিনজনই বার থেকে বের হয়ে যান।

বার থেকে টঙ্গীর মাঠে

দীপের ভাষ্য অনুযায়ী, বার থেকে বেরিয়ে তাহসিফ নিজের মোটরসাইকেলে ওই নারীকে উত্তরার ১৮ নম্বর সেক্টরে তার বাসায় পৌঁছে দেন। দীপও নিজের মোটরসাইকেলে সেখানে যান। তাদের বাসা সামনাসামনি বলে জানান তিনি।

ওই নারীকে নামিয়ে দিয়ে তাহসিফ ও দীপ আলাদা মোটরসাইকেলে টঙ্গীর মাজার বস্তিসংলগ্ন মাঠের দিকে রওনা হন। সেখানে পৌঁছে বস্তির কাছের একটি দোকানের সামনে মোটরসাইকেল রেখে গলি দিয়ে মাঠে প্রবেশ করেন তারা।

দীপ দাবি করেছেন, মাঠে তখন আরও অনেকে ছিলেন, যাদের বেশির ভাগ স্থানীয় মাদকসেবী ও কারবারি। সেখানে তাহসিফ হেরোইন কিনে সেবন করেন বলে তার বক্তব্য। মদ্যপানের পর মাদক সেবন করায় তাহসিফ নিজের ওপর নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে ফেলেছিলেন বলেও দাবি করেন দীপ।

পুলিশের উপস্থিতিতে দৌড়

দীপের ভাষ্য অনুযায়ী, কিছুক্ষণ পর টহল পুলিশের উপস্থিতি টের পেয়ে স্থানীয় মাদক কারবারিরা পালিয়ে যান। তিনিও নদীর পাড়ের দিকে দৌড়ে যান। পরে নদীর ২৯ নম্বর পিলারের পেছনে লুকিয়ে ছিলেন বলে জানান তিনি।

দীপের দাবি, দুই থেকে তিন মিনিট পর দুই পুলিশ সদস্য তাকে ঘিরে ধরেন। নাম-পরিচয় ও ঠিকানা জানতে চাইলে তিনি নিজেকে তাহসিফের বন্ধু পরিচয় দিয়ে মোহাম্মদপুরের বাসার ঠিকানা জানান। পুলিশ সদস্যরা তাকে এত রাতে সেখানে আসার কারণ জিজ্ঞাসা করেন। জবাবে তিনি একটি কাজে এসেছেন বলে জানান। পরে পুলিশ তাকে বাসায় চলে যেতে বলে।

দীপ জানান, এরপর তিনি তাহসিফের ফোনে একাধিকবার কল করেন। তবে প্রতিবারই ফোন বন্ধ পান। পরে মোহাম্মদপুরের বাসায় ফিরে ঘুমিয়ে পড়েন বলে তার দাবি।

তিন নারীর নিষেধ সিসিটিভিতে

ঘটনার রাতের টঙ্গী মাজার বস্তির একটি সিসিটিভি ফুটেজে তাহসিফ ও দীপকে মোটরসাইকেল পার্ক করে একটি গলি দিয়ে তুরাগ নদীর তীরের মাঠের দিকে যেতে দেখা গেছে। ওই সময় তিন নারী তাদের সেখানে যেতে নিষেধ করেন বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। ফুটেজের বর্ণনা অনুযায়ী, নারীরা তাদের চলে যেতে বলেন। তখন তাহসিফ দীপকে ইংরেজিতে বেশি কথা না বলে হাঁটতে বলেন।

তদন্তসংশ্লিষ্ট এক কর্মকর্তা জানান, তাহসিফের মরদেহে কোনো আঘাতের চিহ্ন পাওয়া যায়নি। প্রাথমিকভাবে ঘটনাটিকে হত্যাকাণ্ডের বদলে দুর্ঘটনাজনিত মৃত্যু বলে মনে হচ্ছে। পুলিশের উপস্থিতি টের পেয়ে দৌড়ে পালানোর সময় তাহসিফ নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে পানিতে পড়ে যেতে পারেন বলে ধারণা করা হচ্ছে।

তবে দীপ ও ওই নারী এখনো রিমান্ডে রয়েছেন। তাদের আরও জিজ্ঞাসাবাদ করা হবে। প্রাথমিক তদন্তের ধারণা চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নয় বলে জানিয়েছেন সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তা। ময়নাতদন্তের প্রতিবেদন পাওয়ার পর মৃত্যুর প্রকৃত কারণ সম্পর্কে নিশ্চিত হওয়া যাবে।

ময়নাতদন্তের প্রতিবেদনের অপেক্ষা

মামলার তদন্ত কর্মকর্তা ও টঙ্গী নৌ-পুলিশ ফাঁড়ির ইন্সপেক্টর ফিরোজ উদ্দিন জানান, তাহসিফ মাদক সেবন করেছিলেন কি না কিংবা তার শরীরে কোনো বিষ প্রয়োগ করা হয়েছিল কি না, তা পরীক্ষার প্রতিবেদনে জানা যেতে পারে।

এ জন্য তার রক্ত, পাকস্থলী, কিডনিসহ বিভিন্ন অঙ্গের নমুনা পরীক্ষার জন্য পাঠানো হয়েছে। পাশাপাশি ভিসেরা ও রক্তের নমুনা পরীক্ষা করা হচ্ছে। ডিএনএ পরীক্ষার জন্যও নমুনা সংগ্রহ করে পাঠানো হয়েছে।

এসব পরীক্ষার ফল, ময়নাতদন্তের প্রতিবেদন, সিসিটিভি ফুটেজ এবং সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের বক্তব্য বিশ্লেষণ করেই তাহসিফের মৃত্যুর প্রকৃত কারণ সম্পর্কে নিশ্চিত হতে চায় তদন্তকারী দল।