পোশাকশিল্পে অস্থিরতা ঠেকাতে কঠোর অবস্থানে সরকার
শ্রমিক অসন্তোষ ঘিরে নাশকতার অভিযোগ, শিল্পাঞ্চলে ১২ প্লাটুন বিজিবি মোতায়েন; বন্ধ ৩০৬ কারখানা।
নিজস্ব প্রতিবেদক
পোশাকশ্রমিকদের ন্যায্য মজুরির দাবি আলোচনার মাধ্যমে সমাধানের উদ্যোগ নেওয়ার পাশাপাশি শিল্পাঞ্চলে অস্থিতিশীলতা ঠেকাতে কঠোর অবস্থান নিয়েছে সরকার। ঢাকা, গাজীপুর, সাভার, আশুলিয়া ও নারায়ণগঞ্জসহ বিভিন্ন এলাকায় আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর তৎপরতা বাড়ানো হয়েছে। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে অতিরিক্ত পুলিশ সদস্যের পাশাপাশি বর্ডার গার্ড বাংলাদেশ (বিজিবি) মোতায়েন করা হয়েছে।
সংশ্লিষ্ট সূত্রের দাবি, শ্রমিক আন্দোলনকে কেন্দ্র করে উসকানি, অর্থায়ন ও নাশকতার অভিযোগে কয়েকজন শ্রমিকনেতা ও পোশাক কারখানার মালিক গোয়েন্দা নজরদারিতে রয়েছেন। তবে এসব অভিযোগের বিষয়ে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের বক্তব্য প্রতিবেদনে পাওয়া যায়নি।
রাজনৈতিক ইন্ধনের অভিযোগ স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর
স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ বলেছেন, রাজনৈতিক স্বার্থে দেশে অস্থিরতা তৈরির চেষ্টা কোনোভাবেই বরদাশত করা হবে না। তাঁর অভিযোগ, পরাজিত ফ্যাসিবাদী শক্তির সঙ্গে সম্পর্কিত কিছু মহল পরিস্থিতি অস্থিতিশীল করার চেষ্টা করছে। এ ধরনের তৎপরতা কঠোর হাতে দমন করা হবে বলেও জানান তিনি।
কারখানা বন্ধ রেখে শ্রমিকদের সড়কে অবস্থানের বিষয়ে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, বন্ধ কারখানাগুলো দ্রুত চালুর ব্যবস্থা করা হবে। তাঁর ভাষ্য, শ্রমিকদের দাবিদাওয়া পূরণে উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে এবং ন্যূনতম মজুরি নির্ধারণে মজুরি বোর্ড গঠন করা হয়েছে।
শ্রমিকদের জীবনমান উন্নয়নে সহায়ক হয়, এমন বিষয় বিবেচনায় নিয়ে ন্যূনতম মজুরি নির্ধারণের জন্য সরকার বোর্ডকে অনুরোধ জানিয়েছে বলেও জানান তিনি। এ বিষয়ে বোর্ডে আলোচনা হবে বলে উল্লেখ করেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী।
এর আগে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান সংশ্লিষ্টদের কারখানার কার্যক্রম সচল রাখা এবং শ্রমিকদের জানমালের নিরাপত্তা নিশ্চিত করার নির্দেশনা দেন।
প্রায় অর্ধশত মালিক ও শ্রমিকনেতা নজরদারিতে
শিল্পাঞ্চল পুলিশের প্রধান ও অতিরিক্ত আইজিপি গাজী জসিম উদ্দিন বাংলাদেশ প্রতিদিনকে বলেন, শ্রমিক আন্দোলন শুরুর সময় থেকেই পুলিশের প্রস্তুতি ছিল। তবে শ্রমিকদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার পরিবর্তে পরিস্থিতি আলোচনার মাধ্যমে সামাল দেওয়ার চেষ্টা করা হয়েছে।
তাঁর অভিযোগ, মজুরি বোর্ড গঠনের পরও আন্দোলন অব্যাহত থাকায় নিষিদ্ধ সংগঠনের নেতাকর্মী, শ্রমিকনেতাদের একটি অংশ এবং নিষিদ্ধ দলের অনুসারী কিছু মালিক একত্র হয়ে শ্রমিকদের নাশকতার দিকে ঠেলে দিচ্ছেন। নাশকতার চেষ্টা অব্যাহত থাকলে আরও কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া হবে বলেও জানান তিনি।
আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সূত্রের বরাতে প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ঢাকা, গাজীপুর ও নারায়ণগঞ্জে প্রায় অর্ধশত মালিক ও শ্রমিকনেতাকে চিহ্নিত করেছেন গোয়েন্দারা। আওয়ামী লীগের পলাতক কয়েকজন সাবেক সংসদ সদস্য, মেয়র ও নেতার পাশাপাশি আওয়ামী লীগঘনিষ্ঠ কিছু পোশাক ব্যবসায়ীর বিরুদ্ধে আন্দোলনে ইন্ধন দেওয়ার অভিযোগ রয়েছে। তাঁদের নির্দেশনা ও অর্থায়নে স্থানীয় পর্যায়ে প্রায় ১০০ জন নেতা সড়কে বিশৃঙ্খলা, পুলিশের ওপর হামলা ও থানা ঘেরাওয়ের মতো কর্মকাণ্ডে জড়িত বলে সূত্রের দাবি।
আন্দোলন নিয়ন্ত্রণে না এলে নজরদারিতে থাকা ব্যক্তিদের গ্রেপ্তার করা হতে পারে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
মিরপুরের পরিস্থিতি নিয়ে ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনের প্রশাসক মো. শফিকুল ইসলাম খান বলেন, আন্দোলনের নামে অরাজকতা সৃষ্টি করতে দেওয়া হবে না। তাঁর অভিযোগ, আওয়ামী লীগ, যুবলীগ ও ছাত্রলীগের কিছু সদস্য আন্দোলনে যুক্ত হয়ে বিশৃঙ্খলা তৈরির চেষ্টা করছেন। এ ধরনের কর্মকাণ্ডে জড়িত ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা নেওয়া হবে বলেও জানান তিনি।
শিল্পাঞ্চলে ১২ প্লাটুন বিজিবি মোতায়েন
শ্রমিক অসন্তোষের কারণে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে রাখতে শিল্পাঞ্চলে ১২ প্লাটুন বিজিবি মোতায়েন করা হয়েছে। বিজিবি সদর দপ্তরের জনসংযোগ কর্মকর্তা শরীফুল ইসলাম জানান, জননিরাপত্তা নিশ্চিত করা এবং শিল্পকারখানার কার্যক্রম স্বাভাবিক রাখতে বিজিবি সদস্যরা স্থানীয় প্রশাসন ও অন্যান্য আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী সংস্থার সঙ্গে সমন্বয় করে কাজ করছেন।
তিনি জানান, গাজীপুরের সফিপুর, কালিয়াকৈর ও কোনাবাড়ী এলাকায় ১০ প্লাটুন এবং নারায়ণগঞ্জের চাষাঢ়ায় দুই প্লাটুন বিজিবি মোতায়েন রয়েছে। আশুলিয়া ও মিরপুরসহ সংশ্লিষ্ট এলাকার পরিস্থিতিও পর্যবেক্ষণ করা হচ্ছে।
নিরাপত্তা জোরদারে বিজিবি সদর দপ্তরের কেন্দ্রীয় মনিটরিং সেল থেকে ড্রোন ও বডি-ওর্ন ক্যামেরার মাধ্যমে সরাসরি নজরদারি চালানো হচ্ছে বলে প্রতিবেদনে জানানো হয়েছে।
সড়ক অবরোধ ঠেকাতে পুলিশের প্রস্তুতি
পুলিশ সদর দপ্তরের সূত্র জানিয়েছে, সড়ক অবরোধ করে জনভোগান্তি সৃষ্টি ঠেকাতে পুলিশের বিভিন্ন ইউনিট প্রস্তুতি নিয়েছে। সম্ভাব্য অবরোধস্থলগুলোতে নিরাপত্তা জোরদার করা হবে। পুলিশি বাধা উপেক্ষা করে কেউ সড়কে নেমে বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি করলে আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়ার প্রস্তুতি রয়েছে।
ঢাকা মহানগর পুলিশও মিরপুরের পরিস্থিতি নিয়ে কঠোর অবস্থানের কথা জানিয়েছে। ডিএমপির পিওএম দক্ষিণ বিভাগের উপকমিশনার মো. তৌহিদুল আরিফ বলেন, মিরপুর-১০ গোলচত্বরসহ প্রধান সড়ক ও আশপাশের অলিগলিতে নজরদারি এবং তল্লাশি অব্যাহত রয়েছে।
এদিকে শ্রমিক আন্দোলনের আড়ালে নাশকতায় জড়িত থাকার অভিযোগে কার্যক্রম নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগের ৩৩ নেতাকর্মীকে গ্রেপ্তারের কথা জানিয়েছে ডিএমপি।
বন্ধ ৩০৬ পোশাক কারখানা
শ্রমিকেরা কর্মস্থল ছেড়ে বেরিয়ে যাওয়ায় গতকাল ৩০৬টি পোশাক কারখানায় উৎপাদন বন্ধ ছিল বলে জানিয়েছে বাংলাদেশ পোশাক প্রস্তুতকারক ও রপ্তানিকারক সমিতি (বিজিএমইএ)। এসব কারখানায় প্রায় সাত লাখ শ্রমিক কর্মরত।
বিজিএমইএর তথ্য অনুযায়ী, গাজীপুর ও ময়মনসিংহ এলাকায় সবচেয়ে বেশি কারখানায় উৎপাদন বন্ধ ছিল। এ দুই এলাকায় ১৬১টি কারখানায় উৎপাদন বন্ধ হয়, যেখানে প্রায় চার লাখ ২৯ হাজার শ্রমিক কাজ করেন। এ ছাড়া সাভারের আশুলিয়া ও জিরানী এলাকায় ৯৩টি এবং রাজধানীর মিরপুরে ৫২টি কারখানায় উৎপাদন বন্ধ ছিল।
আজ মজুরি বোর্ডের প্রথম সভা
পোশাকশ্রমিকদের নতুন ন্যূনতম মজুরি নির্ধারণে গঠিত মজুরি বোর্ডের প্রথম সভা আজ বুধবার অনুষ্ঠিত হওয়ার কথা রয়েছে। চলমান শ্রমিক অসন্তোষ ও কারখানায় উৎপাদন বন্ধ থাকার মধ্যে বোর্ডের আনুষ্ঠানিক কার্যক্রম শুরু হতে যাচ্ছে।
বিজিএমইএ সভাপতি মাহমুদ হাসান খান জানান, সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে দ্রুত মজুরি বোর্ডের সভা আয়োজনের আহ্বান জানানো হয়েছে। বুধবার সভা অনুষ্ঠিত হবে বলে তাঁরা আশাবাদী।
তিনি বলেন, কারখানাগুলো চালু রাখার চেষ্টা চলছে। শিল্প ও শ্রমিকদের স্বার্থে ভাঙচুর ও বিক্ষোভ থেকে বিরত থাকার জন্য শ্রমিকদের প্রতি আহ্বান জানান তিনি।
চলমান অস্থিরতা নিরসনে মজুরি বোর্ডের আলোচনা এবং আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর পদক্ষেপ কতটা কার্যকর হয়, এখন সেদিকেই নজর সংশ্লিষ্টদের।
খবরটি পড়ে আপনার প্রতিক্রিয়া
প্রতিক্রিয়া জানাতে বা খবর সংরক্ষণ করতে লগইন করুন · নতুন? অ্যাকাউন্ট খুলুন (বিনামূল্যে)
💬 মন্তব্য
✍️ মন্তব্য লিখুন… — মন্তব্য করতে বিনামূল্যে অ্যাকাউন্ট খুলুনএখনো কোনো মন্তব্য নেই। প্রথম মন্তব্যটি আপনিই করুন।
মন্তব্য লেখকের নিজস্ব মত, AllTimeNews-এর নয়। অশালীন, ব্যক্তিগত আক্রমণ বা বিজ্ঞাপনমূলক মন্তব্য মুছে ফেলা হবে। · গোপনীয়তা / Datenschutz





